মোঃ শান্ত শেখ টুঙ্গিপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ০৬:০৩:১৫
টুঙ্গিপাড়ায় পানির বুকে লাল শাপলার গালিচা
শরতের ভোর। কুয়াশার মায়াবী আবেশ কাটিয়ে পূর্ব আকাশে উঁকি দিচ্ছে সূর্য। মিষ্টি রোদের পরশ লাগতেই শান্ত জলের বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে হাজারো লাল শাপলা। সবুজ লতাপাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা শাপলার পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে সূর্যের আলো পড়তেই পুরো বিলজুড়ে যেন বিছিয়ে গেছে রক্তিম গালিচা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, প্রকৃতি নিজ হাতে এঁকেছে এক বিশাল নকশিকাঁথা।
সাদা বক, পানকৌড়ি আর নানা জলজ পাখির অবাধ বিচরণে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের তাঁরাই বিল এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে হয়ে উঠেছে এক মায়াবী সৌন্দর্যের ঠিকানা। শরতের নির্মল সকালে বিলের শান্ত জল, চারপাশের সবুজ আর শাপলার রক্তিম আভা মিলে তৈরি করছে চোখজুড়ানো এক নৈসর্গিক পরিবেশ।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের এ জলাশয়ে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেখা মেলে লাল ও সাদা শাপলার মনোমুগ্ধকর সমারোহ। ভোরের আলো ফুটতেই অসংখ্য শাপলা জেগে ওঠে আপন সৌন্দর্যে। মুহূর্তেই বদলে যায় বিলের চেহারা—নীলাভ পানির ওপর লাল-সাদার ছোঁয়ায় যেন সাজে প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাস।
বিলপাড়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় শত বছর ধরে এ বিলে প্রাকৃতিকভাবেই শাপলা ফুটে আসছে। প্রায় এক কিলোমিটার বিস্তৃত জলাশয়ের বুকে ফুটে থাকা শাপলার সৌন্দর্য এখন ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। ভোর হলেই দর্শনার্থী, প্রকৃতিপ্রেমী, ফটোগ্রাফার ও কনটেন্ট নির্মাতারা ছুটে আসছেন এখানে। কেউ নৌকায় চড়ে, কেউ বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে ক্যামেরাবন্দী করছেন প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য।
তবে এই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝেও রয়েছে উদ্বেগের কারণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ছবি তোলা কিংবা ভিডিও ধারণের সময় কিছু দর্শনার্থী অসচেতনভাবে শাপলা ছিঁড়ে ফেলছেন। এতে একদিকে যেমন বিলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের।
স্থানীয়রা জানান, শাপলা শুধু বিলের সৌন্দর্য বাড়ায় না; এ ফুল সংগ্রহ ও বাজারে বিক্রির সঙ্গে স্থানীয় কিছু পরিবারের জীবিকাও জড়িত। তাই বিলের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় দর্শনার্থীদের ফুল না ছেঁড়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। প্রকৃতিকে উপভোগ করতে হবে, তবে সেই প্রকৃতিকে অক্ষত রেখেই—এমন প্রত্যাশাই তাদের।
এলাকাবাসীর মতে, প্রশাসনের যথাযথ তদারকি, বিলের পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ নৌকা চলাচলের ব্যবস্থা করা গেলে টুঙ্গিপাড়ার এই শাপলা বিলটি ভবিষ্যতে একটি আকর্ষণীয় ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য তৈরি হবে নতুন একটি দর্শনীয় স্থান, পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
যেভাবে যাবেন:
লাল শাপলার সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করতে হলে ভোরেই পৌঁছানো সবচেয়ে ভালো। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত কিংবা গোপালগঞ্জ জেলা শহর থেকে ঘোনাপাড়া হয়ে প্রথমে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা সদরে যেতে হবে। এরপর টুঙ্গিপাড়া থানার সামনের সড়ক ধরে বাগিয়ারকূল হয়ে তারাইল বাজারে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে বেড়িবাঁধের রাস্তা ধরে চর গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে যেতে প্রায় ১ কিলোমিটার গেলেই দেখা মিলবে শাপলায় ভরা সেই মনোমুগ্ধকর বিলের।
শরতের ভোরে শিশিরভেজা লাল শাপলার সারি, শান্ত জলের ঢেউ, সবুজের সমারোহ আর পাখির কলকাকলিতে পুরো বিলটি যেন হয়ে ওঠে প্রকৃতির এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। নগরজীবনের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে এসে এখানে দাঁড়ালে মনে হবে—গ্রামবাংলার চিরচেনা সৌন্দর্য এখনো ঠিক আগের মতোই বেঁচে আছে প্রকৃতির কোলে।