নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুপুর ০১:১৭:৫৮
জনস্বার্থের তোয়াক্কা না করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরকারের দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ: মজিবুর রহমান মঞ্জু
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা রয়েছে। তবে সেই চাপ একসঙ্গে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ধাপে ধাপে ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে মূল্য সমন্বয় করা যেতো। কিন্তু জনস্বার্থের তোয়াক্কা না করে ৭ মাসে ২ বার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরকারের দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিজয়নগরস্থ এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি: জনস্বার্থ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারম্যান এ সব দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানির প্রভাব নিয়ে মূল বক্তব্য রাখেন দলের ছায়া সরকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান। দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া,অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, মোঃ আলতাফ হোসাইন, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এ মূল্যবৃদ্ধির বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন খাত ও সাধারণ ভোক্তার ওপর।আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু সেই চাপ একবারে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে হবে,এমন কোনো নীতি নেই। আমাদের প্রয়োজন price shock নয়, price adjustment।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ পাম্প, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্রের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। সামনে বোরো মৌসুম হওয়ায় এর প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ।আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর আরও চাপ তৈরি করবে।
মঞ্জু বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব পরিবহন ব্যয় থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজারে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ে।শুধু প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে,এভাবে দেখলে বাস্তব অর্থনীতির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। জ্বালানির দাম বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে, এরপর পণ্যের দাম বাড়ে, বলেন তিনি।
জ্বালানির প্রভাব নিয়ে মূল বক্তব্যে ছায়া সরকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান বলেন, সরকার জানিয়েছে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এ চাপ বাস্তব হলেও আন্তর্জাতিক বাজারদর, freight, insurance, exchange rate, tax, handling ও distribution cost এবং BPC-এর প্রকৃত ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সংকটকালীন সময়ে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়, BPC-এর দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় ও জ্বালানি চুরি বন্ধের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
এবি পার্টির এই নেতা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন,
১. কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের ওপর চাপ কমাতে পৃথক মূল্যনীতি গ্রহণ;
২. একবারে বড় মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়;
৩. আন্তর্জাতিক বাজার, freight, exchange rate, import cost ও করের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও formula-based pricing mechanism কার্যকর এবং দাম কমলে জনগণকে সুফল দেওয়া;
৪. সংকটকালে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়ের বিষয় বিবেচনা;
৫. প্রকৃত কৃষক ও কৃষিযন্ত্রের জন্য targeted diesel support চালু;
৬. জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে অযৌক্তিক পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর ভাড়া সমন্বয় ব্যবস্থা;
৭. BPC-এর আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ, procurement, system loss ও জ্বালানি চুরির ওপর স্বাধীন পূর্ণাঙ্গ অডিট;
৮. সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার বন্ধে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা;
৯. সংকট মোকাবিলায় Strategic Fuel Emergency Fund গঠন;
১০. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অডিট ও সমন্বয়ের মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা;
১১. দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
ব্যারিস্টার নোমান আরো বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে নীতি গ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা মেনে নিয়েও জনগণের ওপর এককালীন বড় মূল্য-শক এড়ানো সম্ভব।সরকারের রাজস্ব বাড়াতে হবে, কিন্তু মানুষের পকেট কেটে নয়। কর ফাঁকি বন্ধ, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ এবং progressive revenue mobilisation-এর মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।আমাদের প্রয়োজন price shock নয়, price adjustment; প্রয়োজন এককালীন চাপ নয়, বরং স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও ন্যায়সংগত জ্বালানি মূল্যনীতি, বলেন তিনি।