শামীম আহমেদ, মতলব প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ০৭:১২:৪২
মতলব উত্তর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবাবঞ্চিত রোগীরা
সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে রোগী দেখার কথা চিকিৎসকদের। কিন্তু চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। রোগীদের অভিযোগ, সকাল ৮টার পরিবর্তে অনেক চিকিৎসক হাসপাতালে আসেন আরও দেরিতে। আবার নির্ধারিত কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার আগেই কেউ কেউ ব্যক্তিগত চেম্বারে চলে যান। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা।
শনিবার ও রবিবার হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে চিকিৎসকের অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইন। সকাল থেকে অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের দেখা পেতে দেরি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন রোগী ও স্বজনরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসকদের একটি অংশ নিজেদের সুবিধামতো হাসপাতালে আসা-যাওয়া করেন। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ করে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখার অভিযোগও রয়েছে।
ছেংগারচর এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা কামরুন্নাহার বলেন, হাসপাতালের সেবা নিতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক না পাওয়ায় রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
একই এলাকার রোগী ববিতা আক্তার বলেন, দূর থেকে কষ্ট করে হাসপাতালে এসে যদি সময়মতো চিকিৎসক না পাওয়া যায়, তাহলে সরকারি হাসপাতালে আসার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। অপেক্ষার পরও অনেক সময় চিকিৎসকের দেখা পেতে দেরি হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ষাটনল এলাকা থেকে স্বজনকে নিয়ে হাসপাতালে আসা শাহিন আলম বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে হাসপাতালে আসে। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসক না পাওয়া গেলে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
শুধু চিকিৎসকদের সময়ানুবর্তিতা নয়, হাসপাতালের অন্যান্য সেবার মান নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, কয়েকদিন যাবত হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ কার্যত বন্ধ। নষ্ট হয়ে পড়ে আছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন। কয়েক বছর ধরে বন্ধ এক্স-রে সেবাও, নেই সিজারিয়ান অপারেশনও। ফলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার প্রায় ৫ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা সচল না থাকায় দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে সেবা পাওয়ার সুযোগ না থাকায় বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতালে গাইনি চিকিৎসক থাকলেও তিনি বর্তমানে ডেপুটেশনে ঢাকার পিজি হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে নারী ও প্রসূতি রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাশাপাশি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, সরকারি দায়িত্ব পালনের নির্ধারিত সময় থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকদের কেউ যদি সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত না হন কিংবা দায়িত্বের সময় শেষ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ করেন, তাহলে বিষয়টি তদারকি করছে কে? চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়মিত মনিটরিং এবং অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সমস্যার কারণে হাসপাতালটির ওপর মানুষের আস্থা কমছে। চিকিৎসক, যন্ত্রপাতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ সবগুলো সেবা নিশ্চিত করা না গেলে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন চন্দ্র দাস বলেন, চিকিৎসকদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা রয়েছে। কোনো চিকিৎসক সময়মতো উপস্থিত না থাকলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালের যেসব সেবা নিয়ে সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।