মো: আলমগীর হোসেন, নবীনগর, ( ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ১০:১১:৪২
হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে আশার আলো, বাস্তবে ভোগান্তি
প্রায় ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের পরও কাটেনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারবাসীর দীর্ঘদিনের সড়ক দুর্ভোগ। মাত্র ৫৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কোথাও সরু সড়ক, কোথাও খানাখন্দ, কোথাও ভাঙাচোরা অংশ, আবার কোথাও একের পর এক বাঁক পেরোতে হচ্ছে যাত্রী ও চালকদের। এর সঙ্গে মেঘনা নদী পারাপারে ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। সব মিলিয়ে এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে কখনো সময় লাগছে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি।
ভুলতা থেকে আড়াইহাজার, বাঞ্ছারামপুর, নবীনগর ও শিবপুর হয়ে রাধিকা পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ এ আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশের প্রস্থ মাত্র ১২ ফুট। অথচ আঞ্চলিক মহাসড়কের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্থ প্রায় ৩৪ ফুট। ফলে অনেক স্থানে দুটি যানবাহন পাশাপাশি চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি যানবাহন এ সড়ক দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কড়ইকান্দি থেকে নবীনগর পর্যন্ত প্রায় ৫৭ কিলোমিটার সড়কে রয়েছে প্রায় ১৩৫টি বাঁক। অতিরিক্ত বাঁকের কারণে যানবাহনের গতি কমে যায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। এর ওপর বাঞ্ছারামপুরের কড়ইকান্দি ফেরিঘাটে এসে মেঘনা পারাপারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। যানবাহনের চাপ বাড়লে ঘাটে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয় যাত্রী ও চালকদের।
এ দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয় রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও পণ্যবাহী যানবাহনের যাত্রীদের। জরুরি প্রয়োজনে ঢাকামুখী যাত্রায় নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো অনেক সময় সম্ভব হয় না। দুই উপজেলার অন্তত ২০ থেকে ৩০ গ্রামের মানুষ নিয়মিত এ সড়ক ব্যবহার করেন। এ পথ ধরে বাঞ্ছারামপুরের কড়ইকান্দি ফেরিঘাটে পৌঁছে মেঘনা নদী পার হয়ে আড়াইহাজারের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা। ফলে এ সড়কটি শুধু স্থানীয় যোগাযোগের জন্য নয়, বৃহত্তর অঞ্চলের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্প:
দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল একনেক সভায় প্রায় ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্ত ও টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান বাঁকগুলো সরলীকরণ করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বর্তমানে প্রায় ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি নতুন অ্যালাইনমেন্ট ও বাঁক সরলীকরণের মাধ্যমে কমে প্রায় সাড়ে ৩২ কিলোমিটারে নেমে আসবে। এতে সড়কের দৈর্ঘ্য কমার পাশাপাশি যাত্রার সময়ও কমবে এবং যোগাযোগব্যবস্থা হবে আরও নিরাপদ।
তবে প্রকল্প অনুমোদনের কয়েক বছর পরও পুরোপুরি কাজ শুরু না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা রয়েছে। বিশেষ করে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা দ্রুত নিরসন করে প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে নেওয়ার দাবি তাদের।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউনুস আলী বলেন, ভুলতা থেকে বাঞ্ছারামপুর হয়ে নবীনগর সড়কের প্রকল্পটি মোট পাঁচটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি প্যাকেজের ওয়ার্ক অর্ডার ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। আরেকটি প্যাকেজের সিএস প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ১২ ফুট প্রশস্ত সড়ককে ৩৪ ফুটে উন্নীত করতে ভূমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন। এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ভালো অগ্রগতি হবে।
সেতুর অপেক্ষায় মানুষ:
সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি এ অঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা মেঘনার ওপর প্রস্তাবিত কড়ইকান্দি–বিশনন্দী সেতু। প্রায় ৩ দশমিক ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতু নির্মিত হলে ফেরিনির্ভরতা অনেকটাই কমে যাবে। বর্তমানে ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলেও সেতুটি নির্মিত হলে সরাসরি মেঘনা নদী পার হয়ে আড়াইহাজারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে। এতে নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুরের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ আরও দ্রুত ও নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।
এদিকে আড়াইহাজার, বিশনন্দী, বাঞ্ছারামপুর ও নবীনগর সড়কের দুরবস্থা নিয়ে জাতীয় সংসদে কথা বলেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট আব্দুল মান্নান।
উল্লেখ্য, এ আঞ্চলিক মহাসড়কের শেষাংশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার রাধিকা থেকে নবীনগর পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার সড়ক ইতোমধ্যে প্রশস্ত করা হয়েছে। পুরো সড়কটি একইভাবে উন্নত করা গেলে এ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু সড়ক প্রশস্ত ও সংস্কার করলেই হবে না; প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করা, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসন এবং মেঘনার ওপর প্রস্তাবিত কড়ইকান্দি–বিশনন্দী সেতু নির্মাণের উদ্যোগকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। দ্রুত এসব কাজ বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিনের সড়ক ও ফেরিঘাটের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে এ অঞ্চলের লাখো মানুষের।