নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬ বিকাল ০৪:৩৮:১৩
‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এসআরও’
জাতীয় বাজেটে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশ ও জ্বালানি খাতভিত্তিক নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, বাজেট ঘোষণার মাত্র কয়েকদিন আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারি করা একটি এসআরও সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাদের দাবি, আগামী অর্থবছরের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মোট বরাদ্দের প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিতে ব্যয় হচ্ছে, অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ।
রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গ্রিন লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেটে জ্বালানি খাত: নাগরিক প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা তুলে ধরে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) বাংলাদেশ এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামে কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ব্যয় ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে। এতে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। তবে ৮ জুন জারি করা এনবিআরের এসআরওতে এমন কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা আবাসিক গ্রাহক, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই সুবিধা মূলত বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও পিপিএভিত্তিক সৌর প্রকল্পগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী ও বিডব্লিউজিইডির সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেও এনবিআরের এসআরও সেই অগ্রযাত্রার পথেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এটি বাতিল করে কর-সুবিধা সকল নাগরিক ও উদ্যোক্তার জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
বক্তারা আরও বলেন, সরকার একদিকে এলএনজি আমদানিকে অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করছে, অন্যদিকে এলএনজি ও কয়লা আমদানিতে কর-সুবিধা বহাল রেখেছে। একই সঙ্গে নতুন রিফাইনারি স্থাপন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেশের সবুজ জ্বালানি রূপান্তরের গতিকে মন্থর করতে পারে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট ১৭ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ মাত্র ৩৭৯ কোটি টাকা। অথচ ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে বছরে কমপক্ষে ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি বাজেট ও নীতিতে তার প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জ্বালানি বৈষম্য এবং রাজধানীর বাইরের বিদ্যুৎ সংকট দূর করা সম্ভব হবে না।
জলবায়ু কর্মী ফারাহ আনজুম বলেন, জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দের প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিতে যাচ্ছে। তাহলে সরকারের নীতিগত অবস্থান এবং বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে সামঞ্জস্য কোথায়, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে এনবিআরের এসআরও বাতিল, ২৫ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন, আবাসিক সৌরবিদ্যুতে সরাসরি ভর্তুকি, কর্পোরেট বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি কার্যকর, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু এবং জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দূষণকারী শিল্পে প্রগতিশীল নির্গমন কর আরোপ।
বক্তাদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের মূল কারণ জ্বালানির ঘাটতি নয়, বরং নীতিগত অগ্রাধিকারের সংকট। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু প্রতিশ্রুতি অর্জনে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যয়বহুল পথ থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক স্বনির্ভর অর্থনীতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।