ক্যাটাগরি

সামাজিক মাধ্যম

লুকানো খিদে: বাংলাদেশের শিশুদের নীরব সংগ্রাম

লুকানো খিদে: বাংলাদেশের শিশুদের নীরব সংগ্রাম


বিগত দুই দশকে শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও ছোট শিশুদের পুষ্টিহীনতা এখনও দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি বা stunting-এর সমস্যায় ভোগে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ও সুষম পুষ্টি না পাওয়ার কারণে তারা বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক উচ্চতায় বেড়ে উঠতে পারে না। এছাড়া প্রায় ১০ শতাংশ শিশু উচ্চতার তুলনায় অতিরিক্ত রোগা বা wasting-এর সমস্যায় ভোগে, যা তীব্র অপুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই সমস্যাগুলো কেবল একটি শিশুর গ্রোথ চার্টের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথম দৃষ্টিতে অপুষ্টিকে কেবল পর্যাপ্ত খাবারের অভাবজনিত সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কারণ অনেক শিশু প্রতিদিন নিয়মিত খাবার খেলেও শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পর্যাপ্ত পরিমাণে পায় না। এই অবস্থাকে বলা হয় 'লুকানো খিদে' বা Hidden Hunger। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি পর্যাপ্ত ক্যালোরি গ্রহণ করলেও তার শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থেকে যেতে পারে। বিষয়টি সহজভাবে ভাবা যেতে পারে। খাবার আমাদের শরীরে শক্তি জোগায় ঠিকই, কিন্তু একটি শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা ও বিকাশের জন্য শুধু ক্যালোরি যথেষ্ট নয়। শরীরের বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে আয়রন, জিঙ্ক, আয়োডিন, ভিটামিন এ ও ক্যালসিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এসব পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে শিশুদের ক্ষুধার্ত না দেখালেও নানা ধরনের পুষ্টিজনিত সমস্যার মুখোমুখি করে থাকে। এমন পরিস্থিতিতেই ফর্টিফাইড বা বাড়তি পুষ্টি যুক্ত খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।কারণ এটি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে আমরা প্রতিদিন যে খাবারগুলো নিয়মিত খাই, সেগুলোতে বাড়তি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান যোগ করা হয়। এর মূল ধারণাটি খুবই সহজ। পরিবারগুলোকে তাদের খাবারের অভ্যাস একেবারে বদলে ফেলতে বলার চাইতে, প্রতিদিনের পরিচিত খাবারের সাথে ফর্টিফাইড খাবার যোগ করে সেগুলোকে আরও পুষ্টিকর করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, মানুষের শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দূর করতে ফর্টিফাইড খাবার যোগ করা সবচেয়ে কার্যকর ও কম খরচের উপায়গুলোর একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক পুষ্টি সংস্থা খাদ্য ফর্টিফিকেশনকে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি কমানোর একটি প্রতিষ্ঠিত ও ব্যয়সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে। এর পেছনের কারণও সহজ। দৈনন্দিন খাবার আমাদের শক্তি ও পুষ্টি জোগালেও শিশুদের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টিগুণ সবসময় পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া নাও যেতে পারে। ফর্টিফাইড খাবার সেই ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে। বিশ্বজুড়ে আয়োডিনের অভাব, আয়রনের ঘাটতি, ভিটামিন এ-র অভাব এবং অন্যান্য পুষ্টিজনিত সমস্যা মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে ফর্টিফাইড খাবার ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও মায়েদের পুষ্টি উন্নয়নের লক্ষ্যে এটি অনেক দেশের জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশে পুষ্টিসমৃদ্ধ বা ফর্টিফাইড খাবারের একটি পরিচিত উদাহরণ হলো গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেডের শক্তি+। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত দুধ দিয়ে তৈরি শক্তি+ দইয়ে শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুষ্টি উপাদান যোগ করা হয়। এর পেছনের মূল ধারণা ছিল এমন একটি পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা, যা শিশুদের পরিচিত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সহজে যুক্ত হতে পারে এবং তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। শক্তি+ দই এর পুষ্টিগত প্রভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণাও করা হয়েছে। বাংলাদেশে ফর্টিফাইড দই নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক -এর সংশ্লিষ্টতা ছিল। গবেষণার ফলাফল পরে পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে ফর্টিফাইড দই গ্রহণকারী এবং সাধারণ দই গ্রহণকারী শিশুদের বিভিন্ন পুষ্টি ও বৃদ্ধিসংক্রান্ত সূচক পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় ফর্টিফাইড শক্তি+ দই গ্রহণকারী শিশুদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিসূচক ও বৃদ্ধিসংক্রান্ত সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। এর মধ্যে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা,, আয়োডিন ও প্রোটিন-সম্পর্কিত কিছু সূচক এবং শারীরিক বৃদ্ধির কিছু দিক অন্তর্ভুক্ত ছিল। সহজ কথায়, পুষ্টি বাড়ানো এই দইটি শারীরিক বৃদ্ধি এবং পুষ্টিগুণের অবস্থা উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচকভাবে অবদান রেখেছে বলে মনে করা হয়েছে। এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা জরুরি—ফর্টিফাইড খাবার অপুষ্টির কোনো একক বা সম্পূর্ণ সমাধান নয়। একটি শিশুর পুষ্টিগত সুস্থতা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাবারের সহজলভ্যতা, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, মাতৃ পুষ্টি, শিশুকে সঠিকভাবে খাওয়ানোর অভ্যাস এবং পরিবারে পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা। কোনো একটি পণ্য বা একটি মাত্র উদ্যোগ দিয়ে শিশু অপুষ্টির প্রতিটি দিক সমাধান করা সম্ভব নয়। তবুও, দৈনন্দিন খাবারে যেসব পুষ্টির ঘাটতি থেকে যায়, তা পূরণে ফর্টিফাইড খাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ যখন শিশুদের পুষ্টি উন্নয়নের জন্য কাজ করছে, তখন শক্তি+-এর মতো উদ্যোগ দেখায় যে পরিচিত ও নিয়মিত খাবারের পুষ্টিমান বাড়িয়ে শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণে সহায়তা করা সম্ভব। শিশুর পেট ভরেছে কি না—এই প্রশ্নের পাশাপাশি তাই আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ: সে কি প্রয়োজনীয় পুষ্টিও পাচ্ছে? বাংলাদেশের শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য, পুষ্টি শিক্ষা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে বিজ্ঞানভিত্তিক পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের ব্যবহার। কারণ আজকের শিশুর পুষ্টিই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে আগামী দিনের তার স্বাস্থ্য, শেখার সক্ষমতা এবং সম্ভাবনা।লেখক: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কমিউনিকেশনস কনসালট্যান্ট।

২ সপ্তাহ আগে

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের দেশপ্রেম ও সততা অবিস্মরণীয়

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের দেশপ্রেম ও সততা অবিস্মরণীয়


বাংলা একাডেমির সভাপতি ও দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমম্বয় কমিটির সহ-সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন সৎ, সাহসী, সত্যনিষ্ঠ, নির্ভীক, নির্মোহ ও নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিক। তিনি একাধারে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, প্রখ্যাত গবেষক, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক এবং বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মননশীল জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম ছিল সত্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর।রোববার (৫ জুলাই) মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। পরে নিকটস্থ একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলায় তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা ছিলেন মুহাম্মদ আবদুল হাকিম এবং মা জাহানারা খাতুন।১৯৫৯ সালে তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৬১ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৬৫ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমসহ প্রথিতযশা শিক্ষকদের সান্নিধ্যে এসে প্রগতিশীল চিন্তাচর্চায় উদ্বুদ্ধ হন।পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে চার দশকেরও বেশি সময় অধ্যাপনা করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন জনপ্রিয়, তেমনি একজন গভীর চিন্তাবিদ ও প্রাজ্ঞ গবেষক হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি প্রগতিশীল সাময়িকী লোকায়ত-এর সম্পাদক ছিলেন এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে নিয়মিত প্রবন্ধ ও কলাম লিখেছেন।অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দুই ডজনের কাছাকাছি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২), নৈতিকতা: শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১), রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯), আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪) এবং রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮)। তিনি বার্ট্রান্ড রাসেলের Political Ideals গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন। এছাড়া ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা তাঁর সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। তাঁর কন্যা অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন একজন শিক্ষাবিদ। পুত্র ফয়সল আরেফিন দীপন ছিলেন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী।২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর জঙ্গিদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন ফয়সল আরেফিন দীপন। সন্তানের এমন মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পরও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেননি। বরং তিনি বলেছিলেন, “আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন—উভয় পক্ষই দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে?” এই বক্তব্য তাঁর অসাধারণ সহনশীলতা, মানবিকতা ও রাষ্ট্রচিন্তার গভীরতার পরিচয় বহন করে এবং সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কেবল একজন শিক্ষক বা লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, যিনি আজীবন সাধারণ মানুষের মুক্তি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর প্রবন্ধ, গবেষণা ও চিন্তাধারা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, নৈতিকতা ও মানবিক সমাজ নির্মাণে তাঁর দর্শন আগামী প্রজন্মের জন্যও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যু বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর দেশপ্রেম, সততা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং মুক্তচিন্তার আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন পথ দেখাবে।লেখক: সাধারণ সম্পাদক ও মুখপাত্র, দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটি।

২ মাস আগে

পদ্মার কান্না ফারাক্কা: প্রয়োজন পানির ন্যায্য হিস্যা

পদ্মার কান্না ফারাক্কা: প্রয়োজন পানির ন্যায্য হিস্যা


পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বাংলার মানুষের কৃষি, মৎস্য ও জীবিকার ভিত্তি গড়েছে। কিন্তু সেই ভিত্তিমূলে আঘাত হেনেছে ফারাক্কা বাঁধ দশকের পর দশক। ষাটের দশকের শুরু থেকে পচাত্তর অবধি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর উপর নির্মিত এই বাঁধ বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনে যে ক্ষত তৈরি করেছে তা শুকায়নি আজও। সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ২ হাজার ২৪০ মিটার দীর্ঘ এই বাঁধ নির্মিত হয়। ভারতের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল-গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা ফেরানো। তবে এর ফলে একতরফাভাবে গঙ্গা বা পদ্মার পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয় ও পানিসংকট সৃষ্টি হয়। এটি পদ্মা ও পদ্মাপাড়ের মানুষের কান্না। এই সংকট মোকাবিলায় এবং পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা সময়ের প্রধান দাবি। এটি ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্য এটি অস্তিত্বগত সংকটের কারণ। বাঁধ চালুর আগে থেকেই বাংলাদেশের আপত্তি ছিলো। ১৯৭২-৭৪ সালের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়েছে। তবে ভারত একতরফাভাবে এই বাঁধ চালু করে। এই বাস্তবতায় ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে রাজশাহী থেকে কানসাটের পদ্মাতীর পর্যন্ত ঐতিহাসিক লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ৬৪ কিলোমিটারের সেই পদযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন লক্ষাধিক মানুষ। সেই সময় ভাসানীর বয়স ছিল নব্বই বছরের বেশি এবং তিনি সদ্য হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। তবুও মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি লক্ষ মানুষের সামনে এগিয়ে হেঁটেছেন। মিছিলের শেষে কানসাট প্রান্তরে বিশাল জনসভায় তিনি ঘোষণা দিয়েছেন-ভারত যদি ফারাক্কা সমস্যার সমাধান না করে, তাহলে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু হবে।ভাসানী বুঝেছিলেন- দুর্বল রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর কূটনৈতিক টেবিলে ততক্ষণই শোনা যায় যতক্ষণ জনগণ পথে নেমে সেই কণ্ঠে জোর দেয়। লংমার্চ রাষ্ট্রীয় দাবিকে গণদাবিতে রূপান্তরিত করেছিলো। এটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এটি ভারতের উপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এবং আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গঙ্গার প্রবাহ শুকনো মৌসুমে নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের ১,২১,৪১০ হেক্টর জমির সেচব্যবস্থা হুমকিতের পড়ে। এতে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠ শুকিয়ে গেছে, পদ্মার বুকে জেগেছে অগণিত চর। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে যে পরিমাণ ফসল নষ্ট হয়, তা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। ফারাক্কা-পরবর্তী সময়কালে ভূগর্ভস্থ পানির গতিপথ ধীরে ধীরে দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে। গঙ্গা নদী বর্তমানে বছরের প্রায় নয় মাস আশপাশের ভূগর্ভস্থ জলস্তর থেকে পানি সংগ্রহ করছে। ফলে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে। নদী ও জলাভূমিতে মিনারেল ও নিউট্রিয়েন্ট কমে যাওয়ায় ফাইটোপ্লাকটন উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০%। ফাইটোপ্লাকটন খাদ্যশৃঙ্খলের প্রথম ধাপ হওয়ায় এর ক্ষতি মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে।পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের সংগমস্থল আরিচাঘাটে করা জরিপ অনুযায়ী বর্তমান মৎস্য উৎপাদন ৩৫ বছর আগের তুলনায় মাত্র ২৫%-এ নেমে এসেছে। ১৯৮৩ সালেই লবণাক্ততার রেখা কামারখালির প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে এবং পসুর নদীর মোহনা থেকে ২৪০ কিলোমিটার ভেতরে পৌঁছে গিয়েছিল। সুন্দরবনে মিষ্টি পানির অভাবে লবণাক্ততা ক্রমেই বাড়ছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলছে।দীর্ঘ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছরমেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট পানির হিস্যা নির্ধারিত হয়। তবে চুক্তি বাস্তবায়নে দুর্বলতা ও চুক্তির গ্যারান্টি নিয়ে প্রশ্ন শুরু থেকেই ছিল। এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। অথচ নতুন চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো কোনো দৃশ্যমান আলোচনা শুরু হয়নি। এই নিষ্ক্রিয়তা অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সাল থেকে আবারও একতরফা পানি ব্যবস্থাপনার শিকার হতে পারে বাংলাদেশ। সম্প্রতি সরকারের তৃতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। যার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। মূলত ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির যে সংকট দেখা দেয়, তা থেকে কিছুটা রেহাই পেতেই প্রকল্পটির অনুমোদন করা হয়েছে। কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পদ্মা ব্যারেজ নামে প্রকল্পটি অবশেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে বলে জানা যায়। সংরক্ষিত পানি দিয়ে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এর আগে ২০২৫ সালের ২০ জুন বাংলাদেশ জাতিসংঘের Transboundary Watercourses and International Lakes কনভেনশনে যোগ দেয়। এটি বিশ্বের একমাত্র বৈশ্বিক ও আইনিভাবে বাধ্যতামূলক পানি-বিধিমালা। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ আগে এই কনভেনশনে ছিল না। আন্তর্জাতিক জলপথ আইনের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন আইনগতভাবে অনেক শক্তিশালী হয়েছে।আন্তর্জাতিক সম্পর্কের 'Hydro-hegemony' তত্ত্ব অনুযায়ী, শক্তিশালী উজানের রাষ্ট্র প্রায়ই প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক নদীতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ফারাক্কা বাঁধ এই তত্ত্বের একটি পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ। ভারত উজানের সুবিধাজনক অবস্থান ব্যবহার করে একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে।আন্তর্জাতিক নদী আইনের 'equitable and reasonable use' নীতি অনুযায়ী, আন্তসীমান্ত নদীতে প্রতিটি রাষ্ট্রের ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহারের অধিকার আছে। ভাটির দেশের কৃষি, জনজীবন ও পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব না ফেলে উজানের দেশ পানি ব্যবহার করতে পারে — এটাই আন্তর্জাতিক আইনের ভাষ্য। ফারাক্কার বাস্তবতা এই নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।শুধু ফারাক্কা নয়, তিস্তা, মনু, মহানন্দাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীকে একটি সামগ্রিক নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। ইউরোপের দানিউব কমিশন, আফ্রিকার নাইল বেসিন উদ্যোগ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেকং রিভার কমিশন দেখিয়ে দিয়েছে — পানিবণ্টনকে শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখলে সমাধান সম্ভব। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশকে একত্রিত করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে উত্থাপন করা উচিত।১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে যে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তা কেবল একটি রাজনৈতিক মিছিল না, ছিল একটি জাতির আত্মসম্মানের ঘোষণা। রাজশাহী থেকে কানসাটের পদ্মাতীর পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের সেই পদযাত্রা প্রমাণ করেছিল একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রও তার ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে মাথা নত করতে প্রস্তুত নয়। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভারত একতরফাভাবে পদ্মার পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠ শুকিয়ে যায়, পদ্মার বুকে জেগে ওঠে চর, মৎস্যজীবীদের জালে মাছ ওঠা বন্ধ হয়। এই সংকট শুধু পরিবেশগত না এটা সার্বভৌমত্বেরও সংকট। প্রতিবেশী রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নদীর উপর একতরফা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনকে জিম্মি করে রেখেছে।ভাসানীর লংমার্চ আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে নিয়ে আসার একটি সাহসী প্রয়াস ছিল। কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে দুর্বল রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর ততক্ষণই শোনা যায়, যতক্ষণ জনগণ পথে নেমে সেই কণ্ঠে জোর দেয়। লংমার্চ ছিল গণ-কূটনীতির এক নজির। রাষ্ট্রীয় দাবিকে গণদাবিতে রূপান্তরের এক বিপ্লবী পদ্ধতি। ভাসানীর পায়ে হাঁটা শুধু প্রতীকী ছিল না; ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঘোষণা।ফারাক্কা লংমার্চের চেতনা আজও প্রাসঙ্গিক, বরং আরও বেশি। পানি-বণ্টন চুক্তি হয়েছে, তবু তিস্তার বুক শুকনো। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা এখনও অনিশ্চিত। বন্দর, ট্রানজিট ও সীমান্ত-বাণিজ্যের প্রশ্নে অসম সম্পর্কের ছায়া এখনও দীর্ঘ। এই প্রেক্ষাপটে ফারাক্কার শিক্ষা হলো- জাতীয় অধিকার আদায়ে কেবল সরকারি পর্যায়ের দরকষাকষি যথেষ্ট নয়; দরকার গণ-জাগরণ, সংগঠিত গণচাপ।ফারাক্কা লংমার্চ এই সত্যও প্রতিষ্ঠা করেছিল জাতীয় অধিকারের প্রশ্নটি কেবল ভূখণ্ড বা সম্পদের প্রশ্ন নয় এটি মর্যাদার প্রশ্ন। সেই চেতনাকে লালন করা মানে কেবল ইতিহাস স্মরণ করা নয়-মানে বর্তমানের অসাম্যের বিরুদ্ধেও সমান সাহসে দাঁড়ানো।যতদিন আন্তর্জাতিক নদীতে ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত না হবে, যতদিন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছোট রাষ্ট্রগুলো চাপের মুখে তাদের সার্বভৌম অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে-ততদিন মওলানা ভাসানীর সেই পদচিহ্নগুলো পথ দেখাবে।লেখক: নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী

৩ মাস আগে

মধ্যপাড়ায় লেড এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি: প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বাঁচাতে পদক্ষেপ জরুরি

মধ্যপাড়ায় লেড এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি: প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বাঁচাতে পদক্ষেপ জরুরি


আমাদের সবুজ শ্যামল অঞ্চল আজ এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপিত কে.জি এন্টারপ্রাইজ নামের লেড এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি স্থানীয় মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামের মানুষ আজ আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ। কারণ তারা বুঝতে পারছেন, এই কারখানা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া এক নীরব বিষের গজব উৎপাদন কারখানা।লেড এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং শিল্প পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে “রেড ক্যাটাগরি”ভুক্ত শিল্প হিসেবে বিবেচিত। এ ধরনের কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ও পরিবেশগত বিধিনিষেধ মানা বাধ্যতামূলক। পরিবেশ অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, কারখানা স্থাপনের পূর্বে অবস্থানগত ছাড়পত্র (Site Clearance), পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা (EIA Report), স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ, পরিবেশ দূষণের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনাপত্তিপত্র (NOC) সংগ্রহ করা আবশ্যক।কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মধ্যপাড়ায় স্থাপিত এই কারখানার ক্ষেত্রে এসব গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কিছুই যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপস্থিতিতে কোনো জনমত যাচাই হয়নি, এলাকাবাসীকে প্রকল্পের ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রকৃত মতামতও গ্রহণ করা হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এমন একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কারখানা জনবসতির এত কাছে স্থাপনের অনুমতি পেল?লেড দূষণ পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ বিষাক্ত দূষণের একটি। ব্যাটারি রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় বাতাসে সীসার কণা ছড়িয়ে পড়ে, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়া, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, শ্বাসকষ্ট, স্নায়বিক সমস্যা এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। একইসাথে মাটি ও পানিদূষণের কারণে কৃষিজমি, মাছ, গবাদিপশু এবং পুরো জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে।স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট হয়েছে, মানুষের মধ্যে এখন একটাই দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে: এই কারখানা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কারণ মানুষ আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাঁচার নিশ্চয়তা চায়।এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞদের পরামর্শে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ব্যক্তিকে নিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ধারা ৮(১)-এর আওতায় প্রতিকার চেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক বরাবরও অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্দোলন এখন আবেগের জায়গা থেকে বেরিয়ে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পথে প্রবেশ করেছে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশাসন কী করবে?আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও যদি কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে তা হবে জনগণের জীবন ও পরিবেশের প্রতি চরম অবহেলা। বাস্তবতা হলো, এ ধরনের অনেক পরিবেশবিধ্বংসী কারখানা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক নীরবতা কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর টিকে থাকে। আইনের ফাঁক-ফোকর দেখিয়ে কিংবা দীর্ঘসূত্রতার অজুহাতে জনগণকে “হাইকোর্ট দেখানো” কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না।সরকারকে মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন কখনো মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করে হতে পারে না। একটি গ্রামের বাতাস, পানি, মাটি এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে বিষাক্ত করে তোলা কোনো শিল্পায়ন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধে অপরাধ।প্রাণ বাঁচাতে, প্রকৃতি বাঁচাতে, এই বিষাক্ত লেড এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি বন্ধ করুন। একইসাথে ইতোমধ্যে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয়েছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি। লেখক: কবি ও রাজনীতিবিদ

৩ মাস আগে

ডুবন্ত ধান, ডুবন্ত জীবন: হাওরের কৃষকের টিকে থাকার লড়াই

ডুবন্ত ধান, ডুবন্ত জীবন: হাওরের কৃষকের টিকে থাকার লড়াই

৭ মে ২০২৬ বিকাল ০৪:৩৮:১২

আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর নতুন ধারার সিদ্ধান্ত, প্রশংসায় ভাসছেন তারেক রহমান

আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর নতুন ধারার সিদ্ধান্ত, প্রশংসায় ভাসছেন তারেক রহমান

৬ মার্চ ২০২৬ রাত ০৭:৩৫:২১

উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশে মশা দমনের আধুনিক পথ

উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশে মশা দমনের আধুনিক পথ

৪ মার্চ ২০২৬ দুপুর ০২:১৩:১৪

ধর্মীয় ছাত্র থেকে ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে

ধর্মীয় ছাত্র থেকে ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে

১ মার্চ ২০২৬ রাত ১০:৫৪:১৭

শিরোনাম
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উত্তরা লিবার্টি ক্লাবে মদের পাহাড়, র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার ২ হরমুজে কমছে জাহাজ চলাচল, বাড়ছে তেলের দাম চীনের নাগরিকদের ভ্রমণে নতুন বিধি কসবা সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় বিজিবির অভিযান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ ইউপি নির্বাচনের তারিখের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়নি: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধ: ওবায়দুল কাদের-আরাফাতসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড শহীদ সেনাসদস্যদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম সিলেট সফর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সৌদির ৩ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হুথিদের, ১৩ বেসামরিক আহত আজ সিলেট সফরে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উত্তরা লিবার্টি ক্লাবে মদের পাহাড়, র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার ২ হরমুজে কমছে জাহাজ চলাচল, বাড়ছে তেলের দাম চীনের নাগরিকদের ভ্রমণে নতুন বিধি কসবা সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় বিজিবির অভিযান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ ইউপি নির্বাচনের তারিখের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়নি: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধ: ওবায়দুল কাদের-আরাফাতসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড শহীদ সেনাসদস্যদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম সিলেট সফর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সৌদির ৩ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হুথিদের, ১৩ বেসামরিক আহত আজ সিলেট সফরে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি