চৌধুরী নাঈম আহমেদ মুজিব
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬ সকাল ১০:৪৬:৫৯
লুকানো খিদে: বাংলাদেশের শিশুদের নীরব সংগ্রাম
বিগত দুই দশকে শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও ছোট শিশুদের পুষ্টিহীনতা এখনও দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি বা stunting-এর সমস্যায় ভোগে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ও সুষম পুষ্টি না পাওয়ার কারণে তারা বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক উচ্চতায় বেড়ে উঠতে পারে না। এছাড়া প্রায় ১০ শতাংশ শিশু উচ্চতার তুলনায় অতিরিক্ত রোগা বা wasting-এর সমস্যায় ভোগে, যা তীব্র অপুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এই সমস্যাগুলো কেবল একটি শিশুর গ্রোথ চার্টের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রথম দৃষ্টিতে অপুষ্টিকে কেবল পর্যাপ্ত খাবারের অভাবজনিত সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কারণ অনেক শিশু প্রতিদিন নিয়মিত খাবার খেলেও শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পর্যাপ্ত পরিমাণে পায় না। এই অবস্থাকে বলা হয় 'লুকানো খিদে' বা Hidden Hunger। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি পর্যাপ্ত ক্যালোরি গ্রহণ করলেও তার শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
বিষয়টি সহজভাবে ভাবা যেতে পারে। খাবার আমাদের শরীরে শক্তি জোগায় ঠিকই, কিন্তু একটি শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা ও বিকাশের জন্য শুধু ক্যালোরি যথেষ্ট নয়। শরীরের বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে আয়রন, জিঙ্ক, আয়োডিন, ভিটামিন এ ও ক্যালসিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এসব পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে শিশুদের ক্ষুধার্ত না দেখালেও নানা ধরনের পুষ্টিজনিত সমস্যার মুখোমুখি করে থাকে।
এমন পরিস্থিতিতেই ফর্টিফাইড বা বাড়তি পুষ্টি যুক্ত খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।কারণ এটি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে আমরা প্রতিদিন যে খাবারগুলো নিয়মিত খাই, সেগুলোতে বাড়তি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান যোগ করা হয়। এর মূল ধারণাটি খুবই সহজ। পরিবারগুলোকে তাদের খাবারের অভ্যাস একেবারে বদলে ফেলতে বলার চাইতে, প্রতিদিনের পরিচিত খাবারের সাথে ফর্টিফাইড খাবার যোগ করে সেগুলোকে আরও পুষ্টিকর করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, মানুষের শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দূর করতে ফর্টিফাইড খাবার যোগ করা সবচেয়ে কার্যকর ও কম খরচের উপায়গুলোর একটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক পুষ্টি সংস্থা খাদ্য ফর্টিফিকেশনকে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি কমানোর একটি প্রতিষ্ঠিত ও ব্যয়সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে। এর পেছনের কারণও সহজ। দৈনন্দিন খাবার আমাদের শক্তি ও পুষ্টি জোগালেও শিশুদের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টিগুণ সবসময় পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া নাও যেতে পারে। ফর্টিফাইড খাবার সেই ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে আয়োডিনের অভাব, আয়রনের ঘাটতি, ভিটামিন এ-র অভাব এবং অন্যান্য পুষ্টিজনিত সমস্যা মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে ফর্টিফাইড খাবার ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও মায়েদের পুষ্টি উন্নয়নের লক্ষ্যে এটি অনেক দেশের জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে পুষ্টিসমৃদ্ধ বা ফর্টিফাইড খাবারের একটি পরিচিত উদাহরণ হলো গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেডের শক্তি+। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত দুধ দিয়ে তৈরি শক্তি+ দইয়ে শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুষ্টি উপাদান যোগ করা হয়। এর পেছনের মূল ধারণা ছিল এমন একটি পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা, যা শিশুদের পরিচিত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সহজে যুক্ত হতে পারে এবং তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
শক্তি+ দই এর পুষ্টিগত প্রভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণাও করা হয়েছে। বাংলাদেশে ফর্টিফাইড দই নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক -এর সংশ্লিষ্টতা ছিল। গবেষণার ফলাফল পরে পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে ফর্টিফাইড দই গ্রহণকারী এবং সাধারণ দই গ্রহণকারী শিশুদের বিভিন্ন পুষ্টি ও বৃদ্ধিসংক্রান্ত সূচক পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় ফর্টিফাইড শক্তি+ দই গ্রহণকারী শিশুদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিসূচক ও বৃদ্ধিসংক্রান্ত সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। এর মধ্যে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা,, আয়োডিন ও প্রোটিন-সম্পর্কিত কিছু সূচক এবং শারীরিক বৃদ্ধির কিছু দিক অন্তর্ভুক্ত ছিল। সহজ কথায়, পুষ্টি বাড়ানো এই দইটি শারীরিক বৃদ্ধি এবং পুষ্টিগুণের অবস্থা উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচকভাবে অবদান রেখেছে বলে মনে করা হয়েছে।
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা জরুরি—ফর্টিফাইড খাবার অপুষ্টির কোনো একক বা সম্পূর্ণ সমাধান নয়। একটি শিশুর পুষ্টিগত সুস্থতা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাবারের সহজলভ্যতা, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, মাতৃ পুষ্টি, শিশুকে সঠিকভাবে খাওয়ানোর অভ্যাস এবং পরিবারে পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা। কোনো একটি পণ্য বা একটি মাত্র উদ্যোগ দিয়ে শিশু অপুষ্টির প্রতিটি দিক সমাধান করা সম্ভব নয়।
তবুও, দৈনন্দিন খাবারে যেসব পুষ্টির ঘাটতি থেকে যায়, তা পূরণে ফর্টিফাইড খাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ যখন শিশুদের পুষ্টি উন্নয়নের জন্য কাজ করছে, তখন শক্তি+-এর মতো উদ্যোগ দেখায় যে পরিচিত ও নিয়মিত খাবারের পুষ্টিমান বাড়িয়ে শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণে সহায়তা করা সম্ভব।
শিশুর পেট ভরেছে কি না—এই প্রশ্নের পাশাপাশি তাই আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ: সে কি প্রয়োজনীয় পুষ্টিও পাচ্ছে? বাংলাদেশের শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য, পুষ্টি শিক্ষা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে বিজ্ঞানভিত্তিক পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের ব্যবহার। কারণ আজকের শিশুর পুষ্টিই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে আগামী দিনের তার স্বাস্থ্য, শেখার সক্ষমতা এবং সম্ভাবনা।
লেখক: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কমিউনিকেশনস কনসালট্যান্ট।