সরিষার মধ্যে ভূত
রুহুল আমিন কিবরিয়া, বগুড়া জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৬ আগস্ট ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩:৫৮
পরিবেশবাদী নেতার প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা বর্জ্যের স্তূপ, জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
বগুড়া শহরের জয়পুরপাড়া এলাকায় চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে সংগ্রহ করা ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা বর্জ্য দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশসম্মত উপায়ে অপসারণ বা ধ্বংস না করে উন্মুক্ত স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এই কারণে যে, বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান 'স্বপ্ন'–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান একই সঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে পরিবেশ রক্ষার দাবিদার একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই পরিবেশ দূষণের অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময় ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রায় দুই দশক ধরে বগুড়া শহরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো থেকে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহ করা হলেও তা নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে না। ফলে রক্তমাখা ব্যান্ডেজ, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইনের সেট, গ্লাভসসহ সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকছে।
সরেজমিনে জয়পুরপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা বর্জ্য খোলা জায়গায় জমে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত পদ্ধতিতে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত বা ধ্বংস না করে বছরের পর বছর তা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্জ্য শোধনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও তা কার্যকর নয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, বর্জ্যের একটি অংশ প্রকাশ্যেই আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়। এতে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া ও তীব্র দুর্গন্ধ আশপাশের পরিবেশ দূষিত করছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চিকিৎসা বর্জ্যের এই স্তূপের অদূরেই রয়েছে অন্তত ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। কয়েকটি মহল্লার মানুষের চলাচলের প্রধান সড়কও বর্জ্যের পাশ দিয়ে গেছে। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দা সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে ওই পথ ব্যবহার করছেন। বর্ষাকালে বর্জ্যমিশ্রিত পানি আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা মিতা রানী ও জয়ন্ত কুমার বলেন, বর্ষাকালে বর্জ্য পানিতে ভেসে বাড়ির সামনে চলে আসে। কখনও ব্যবহৃত ইনজেকশনের সুচে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। দুর্গন্ধ, নোংরা পানি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত বসবাস করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মোহাম্মদ আলী হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করে। কিন্তু সেই অর্থের বিপরীতে নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হচ্ছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে 'স্বপ্ন' প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহ না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতো। তবে বিভিন্ন কারণে কিছু বর্জ্য জমে গেছে এবং দ্রুত তা অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত ও মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নজরদারির অভাবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের বগুড়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহাথীর বিন মোহাম্মদ বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দেখা হবে।
অন্যদিকে বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে চিকিৎসা বর্জ্যের স্তূপ দ্রুত অপসারণ, পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত এবং দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় এই অব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট ডেকে আনতে পারে।