নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ সকাল ১০:৪৭:৩৬
ঈদের ছুটিতে যেতে পারেন দক্ষিণের স্বর্গভূমি চর হেয়ারে
ঈদের ছুটিতে সমুদ্রের টানে অনেকেই ছুটে যান দক্ষিণের পর্যটন শহর কুয়াকাটায়। তবে এই সমুদ্রকন্যার পাশেই রয়েছে আরেক অপার বিস্ময়- নিঃশব্দ, নির্জন ও স্বপ্নময় চর হেয়ার। বঙ্গোপসাগরের বিশাল নীল বুকে স্বপ্নের মতো জেগে ওঠা এই দ্বীপ যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার।
দূর থেকে দেখলে মনে হয়, দিগন্তজোড়া জলরাশির মাঝখানে সৃষ্টিকর্তা যেন নিভৃতে গড়ে তুলেছেন এক টুকরো স্বর্গভূমি। কাছে গেলে সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়।
অসীম আকাশ আর অনন্ত সাগরের মিলনরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা এই দ্বীপ যেন প্রকৃতির এক নিঃশব্দ কবিতা। সোনালি বালুকাবেলা, ঢেউয়ের ছন্দময় আছড়ে পড়া আর বাতাসের স্নিগ্ধ স্পর্শ সব মিলিয়ে চর হেয়ার এক অনাবিল প্রশান্তির ঠিকানা।
দ্বীপের ভেতরে পা রাখলেই মেলে আরেক ভিন্ন জগতের দেখা। গহীন বনের ছায়াঘেরা পথ, পাখিদের নিরন্তর কলকাকলি আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ সব মিলিয়ে এখানে বিরাজ করে এক অপার্থিব নির্জনতা। মনে হবে, কোলাহলমুখর পৃথিবী থেকে আপনি অনেক দূরে, যেখানে সময়ও যেন ধীর হয়ে যায়। এখানে শত শত পাখির কলরবে ভোরের নীরবতা ভাঙে, বিস্তীর্ণ বালুচরে লাল কাঁকড়ার দল ছুটে বেড়িয়ে আঁকে জীবনের চঞ্চল রেখাচিত্র। ঢেউয়ের ফেনায় ভেজা তটরেখা, দূরে ভাসমান মাছধরা নৌকা আর আকাশজুড়ে সাদা মেঘ সব মিলিয়ে চর হেয়ার স্বপ্নীল জগৎ।
সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে কুয়াকাটা ভ্রমণের সঙ্গে চর হেয়ার হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য। এই ঈদের ছুটিতে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে দক্ষিণের এই নিভৃত দ্বীপে কাটাতে পারেন এক ভিন্ন রকম সময়। যেখানে প্রকৃতি নিজেই আপনার ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
ভৌগোলিক অবস্থান
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার শেষ প্রান্তে অবস্থিত চর হেয়ার। কেউ কেউ একে ‘হেয়ার চর’ নামেও ডাকেন। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘কলা গাছিয়ার চর’ নামেও পরিচিত। চরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রয়েছে বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ‘সোনার চর’, যেখানে হরিণসহ নানা প্রজাতির প্রাণীর দেখা মেলে। পূর্বে চর আন্ডা, পশ্চিমে চর তুফানিয়া, উত্তরে টাইগার দ্বীপ ও তার পাশেই চর কাশেম। এসব চরের নান্দনিক দৃশ্যও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। কুয়াকাটা থেকে সাগরপথে এই চরের দূরত্ব ৩৫.১৯ কিলোমিটার। আর রাঙ্গাবালী উপজেলা থেকে চরটির দূরত্ব ১০ কিলোমিটার।
ভ্রমণের আদর্শ সময়
বঙ্গোপসাগর তুলনামূলক শান্ত থাকায় এখানে ভ্রমণের আদর্শ সময় শীতকাল। এ সময় অতিথি পাখির দেখা মেলে বেশি। তবে এই সময়েও চরটির সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো।
যেসব সুবিধা রয়েছে
চর হেয়ারে রাত্রিযাপনের জন্য রয়েছে ছোট ছোট তাবু ও কটেজ। তাবু প্রতি ভাড়া এক রাতের জন্য ৪০০ টাকা। সমুদ্রের ঢেউয়ের কলকল ধ্বনি শুনতে শুনতে নির্জন রাতে তাবুতে কাটানো সময় হয়ে উঠতে পারে অনন্য অভিজ্ঞতা। এছাড়া সৈকতে পর্যটকদের জন্য রয়েছে ছাতাসহ আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা। বনভূমির ভেতরে গাছের সঙ্গে বাঁধা দোলনা শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সব বয়সীদের জন্য আনন্দদায়ক।
খাবারের জন্য রয়েছে সাগরের তাজা মাছ, মুরগি, ভাতসহ বিভিন্ন প্যাকেজ। থাকা, খাওয়া, ট্রলার সার্ভিস, তাবু ও কটেজসহ ভ্রমণের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘সোনার চর ট্যুরিজম অ্যান্ড ট্রাভেলস’। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও চর হেয়ার ট্যুরিস্ট নিরাপত্তা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব খান। তার সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর ০১৭১৯৩৬৮১৭৮।
তবে এখানে পর্যাপ্ত দোকান বা ফার্মেসি না থাকায় প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নেওয়া ভালো। মোবাইল চার্জিংয়ের জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাও রাখলে সুবিধা হবে।
যেভাবে যাবেন
নৌপথে: ঢাকার সদরঘাট থেকে সরাসরি লঞ্চে রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ লঞ্চঘাটে পৌঁছানো যায়। ডেকের ভাড়া ৬৫০ টাকা এবং সিঙ্গেল কেবিন ১২০০ টাকা। সেখান থেকে ১৫০০ টাকায় ট্রলার (রিজার্ভ) বা ২০০০ টাকায় স্পিডবোটে চর হেয়ারে যাওয়া যায়। কয়েকজন মিলে গেলে ভাড়া ভাগাভাগি করা সম্ভব।
সড়কপথে: ঢাকার সায়েদাবাদ বা যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে পটুয়াখালী চৌরাস্তা পর্যন্ত বাসভাড়া প্রায় ৬৫০ টাকা। সেখান থেকে মোটরসাইকেলে ২৫০ টাকায় ৪০ মিনিটে হরিদেবপুর ফেরিঘাট। ট্রলারে ১০ টাকায় গলাচিপা শহরে উঠে মোটরসাইকেলে ১৫০ টাকায় পানপট্টি লঞ্চঘাটে পৌঁছানো যায় (সময় প্রায় ২৫ মিনিট)। পানপট্টি থেকে প্রতিদিন সকাল ১০টা, দুপুর ১২টা, দুপুর ২টা ও বিকেল ৩টায় লঞ্চ চরমোন্তাজের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা। প্রায় ৩ ঘণ্টার নদীপথে আগুনমুখা ও তেতুলিয়া নদীর মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। চরমোন্তাজ থেকে ট্রলারে আধাঘণ্টা এবং স্পিডবোটে ১৫ মিনিটে পৌঁছে যাবেন চর হেয়ারে।
বিকল্প পথ: গলাচিপার বোয়ালিয়া স্পিডবোট ঘাট থেকে ১০ হাজার টাকায় স্পিডবোট ভাড়া করা যায়। এছাড়া কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকেও ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা স্পিডবোটে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আসা যায়। মাত্র ৩০০০-৩৫০০ টাকায় আপনি চলে আসতে পারবেন চর হেয়ারে।
যা যা দেখবেন
চর হেয়ারে রয়েছে ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্র সৈকত,যেখানে আচড়ে পড়ে সমুদ্রের নীল জলরাশি। দ্বীপের বুকে আছে ঝাউগাছ আর পেয়ারাগাছের বন। এছাড়া আছে নানা আকারের ছইলা, কেওড়া, গেওয়া, বাইন, গোলপাতা, হারগুজি, তাম্বুরা কাঁটার ঝোপঝাড়। সবুজ বনভূমির গাছগুলোতে বিচরণ করে হাজারো দেশীয় ও বিদেশী অতিথি পাখি যার মধুর কণ্ঠে কিচিরমিচির গানে ভুলে যাবেন শহুরে কোলাহলের অবসাদ।
দোলনায় শুয়ে দুলতে দুলতে পাখিদের গানে মুগ্ধ হবেন আপনি। সারস, বক, শামুকখোল, মদনটাকেরা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে আশ্রয় নেয় এখানকার গাছের মগডালে। আর ঝোপগুলো ডাহুক, কোড়াসহ নাম না জানা পাখিদের অভয়ারণ্য সৈকতে বসে সাগরের গর্জন আন্দোলিত করে তোলে মন। এখান থেকে দেখা যায় জেলেদের মাছ ধরা। সূর্যোদয়ের সময় লাল আভায় রাঙা দিগন্ত আর সূর্যাস্তের ক্ষণে সোনালি-কমলা রঙে ঢেকে যাওয়া জলরাশি হৃদয়ে ছড়িয়ে দেয় এক অনির্বচনীয় মায়া। বালুকাময় সৈকত এর চারদিকে দেখা যাবে লাল কাঁকড়া।
এছাড়া এই চরটি চমৎকার এক পিকনিক স্পট। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নানা ব্যবস্থা।
চর হেয়ার শুধু একটি দ্বীপ নয় এ এক অনুভূতি, বিস্ময়, নিঃশব্দ সৌন্দর্যের ঘোষণা। ঈদের ছুটিতে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে প্রকৃতি, নির্জনতা ও সমুদ্রের মিলিত রূপ উপভোগ করতে চাইলে দক্ষিণের এই স্বর্গভূমি হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য।