নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩ মার্চ ২০২৬ দুপুর ০২:০৪:৩১
তেহরানের লৌহমানব আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই: এক আপসহীন যোদ্ধা
আধুনিক ইতিহাসের পাতায় যে কয়েকজন নেতা একক সিদ্ধান্তে একটি অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি কেবল একটি দেশের শাসক নন, বরং পুরো শিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
জন্ম ও শৈশব: অভাবের মাঝেও শিক্ষার আলো
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে আলী খামেনেইর জন্ম। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার বাবা সৈয়দ জাভাদ খামেনেই ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ আলেম, যিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। খামেনেই পরবর্তীকালে তার শৈশব সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘মাঝে মাঝে আমাদের রাতের খাবারে শুধু রুটি আর কিশমিশ জুটত।’ অভাব থাকলেও পড়াশোনায় খামেনেই ছিলেন মেধাবী। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআন শিক্ষা শুরু করেন এবং ১১ বছর বয়সে ধর্মীয় লেবাস (পাগড়ি ও জাব্বা) ধারণ করে মাদ্রাসায় ভর্তি হন।
বিপ্লবের আগুন ও কারাবরণ
১৯৬০-এর দশকে তিনি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সংস্পর্শে আসেন এবং শাহ শাসিত রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। এই অপরাধে তাকে অন্তত ছয়বার গ্রেপ্তার করা হয়। সাভাক (তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা) তাকে নির্মম নির্যাতন করেছিল এবং তিনি তিন বছরের জন্য নির্বাসিতও হয়েছিলেন। কিন্তু এই কারাবাসই তাকে একজন আপসহীন নেতায় পরিণত করে।
প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ও হত্যাচেষ্টা
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর খামেনেই দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ সব পদে আসীন হন। ১৯৮১ সালে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে সেই বছরই একটি বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন, যার ফলে তার ডান হাতটি চিরতরে অকেজো হয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকেই ইরানিরা তাকে ‘জীবন্ত শহীদ’ হিসেবে সম্মান দিতে শুরু করে। তার আট বছরের প্রেসিডেন্সি ছিল মূলত ‘ইরান-ইরাক যুদ্ধ’-এর কঠিন সময় পার করার গল্প।
সুপ্রিম লিডার: ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ৩৭ বছর
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনেইকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। তার দীর্ঘ শাসনামলের প্রধান স্তম্ভগুলো হলো:
* আইআরজিসি (IRGC)-এর উত্থান: তিনি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসকে কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন।
* প্রতিরোধের অক্ষ: লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইয়েমেনের হুথিদের সমর্থন দিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে এক বিশাল প্রভাব বলয় তৈরি করেছেন, যাকে তিনি ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বলেন।
* পারমাণবিক কর্মসূচি: পশ্চিমা বিশ্বের প্রচণ্ড নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সত্ত্বেও তিনি ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছেন।
দর্শনের দর্পণ: খামেনেইর অবিনশ্বর কিছু বক্তব্য
আয়াতুল্লাহ খামেনেইর শাসনকাল ছিল মূলত তার আদর্শিক অবস্থানের প্রতিফলন। তার বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যগুলোই তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি:
* পশ্চিম প্রসঙ্গে: “আমেরিকা হলো ‘বড় শয়তান’। তারা যখন হাসে, তখনো তাদের হাতে লুকানো খঞ্জর থাকে। তাদের ওপর বিশ্বাস করা মানেই হলো নিজের ধ্বংস ডেকে আনা।”
* আঞ্চলিক সংঘাত ও ইসরায়েল: ‘ইসরায়েল কোনো রাষ্ট্র নয়, এটি একটি সন্ত্রাসী গ্যারিসন। এই অবৈধ রাষ্ট্রটির কোনো অস্তিত্ব এই অঞ্চলে থাকবে না।’
* পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ফতোয়া: ‘আমরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা ব্যবহার করি না কারণ আমাদের ধর্ম এটাকে নিষিদ্ধ করেছে। আমাদের শক্তি আমাদের বোমায় নয়, আমাদের জনগণের ঈমানের মধ্যে।’
* তরুণ প্রজন্মের প্রতি: ‘ভবিষ্যৎ তোমাদের হাতে। তোমরা যদি জ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে বিশ্বকে ছাড়িয়ে যেতে পারো, তবে কোনো পরাশক্তি তোমাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না।’
ব্যক্তিগত জীবন ও বিচিত্র পছন্দ
খামেনেইর জীবনযাপন অত্যন্ত সাদামাটা। তিনি নিয়মিত কবিতা পড়েন এবং ফারসি সাহিত্যের গভীর অনুরাগী। এমনকি ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজারেবল’ তার অন্যতম প্রিয় বই। তিনি একজন দক্ষ কোরআন তেলাওয়াতকারী এবং ধর্মীয় পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর জীবন, আদর্শ এবং তার প্রভাবশালী বক্তব্যগুলোকে সমন্বিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ বিস্তারিত ফিচার নিউজ নিচে দেওয়া হলো:
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই: পারস্যের ক্ষমতার ধ্রুবতারা ও তিন দশকের আপসহীন নেতৃত্ব
তেহরান, ইরান — আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে যদি কোনো একজন ব্যক্তির ছায়া সবচেয়ে দীর্ঘ হয়, তবে তিনি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই। ১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ খোমেনির প্রয়াণের পর, যখন দেশটি এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন খামেনেই হাল ধরেন। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কেবল ইরানের ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা নন, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে এক অটল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
জন্ম ও বৈপ্লবিক উত্থান
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল মাশহাদ শহরের এক অতি সাধারণ ধর্মীয় পরিবারে খামেনেইর জন্ম। শৈশবে চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া খামেনেইর প্রধান সম্পদ ছিল তার মেধা ও ধর্মীয় নিষ্ঠা। মাত্র ১১ বছর বয়সে মাদ্রাসায় শিক্ষা শুরু করা এই তরুণ ১৯৬০-এর দশকে আয়াতুল্লাহ খোমেনির সংস্পর্শে এসে রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
বিপ্লবের আগে শাহের শাসনামলে তাকে অন্তত ছয়বার কারাবরণ করতে হয়। নির্বাসন ও নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তিনি দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের শিখরে আরোহণ করেন এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
‘জীবন্ত শহীদ’ ও অদম্য মনোবল
১৯৮১ সালে একটি সংবাদ সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় খামেনেই এক ভয়াবহ বোমা হামলার শিকার হন। এই হামলায় তার ডান হাতটি চিরতরে অকেজো হয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকেই ইরানিরা তাকে ‘জানবাজ’ বা ‘জীবন্ত শহীদ’ হিসেবে অভিহিত করে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তা তাকে ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসায়।
আদর্শিক স্তম্ভ: খামেনেইর বিখ্যাত কিছু বক্তব্য
আয়াতুল্লাহ খামেনেইর শাসনকাল ছিল মূলত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প। তার বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যগুলোই তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি:
আমেরিকা ও পশ্চিম প্রসঙ্গে: তিনি সবসময়ই আমেরিকার আধিপত্যবাদের কট্টর বিরোধী। তার বিখ্যাত উক্তি:
"আমেরিকা হলো 'বড় শয়তান'। তারা যখন হাসে, তখনো তাদের হাতে লুকানো খঞ্জর থাকে। তাদের ওপর বিশ্বাস করা মানেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনা।"
ইসরায়েল ইস্যুতে অবস্থান: মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অস্তিত্বকে তিনি কখনোই মেনে নেননি। তার ভাষায়:
"ইসরায়েল কোনো রাষ্ট্র নয়, এটি একটি সন্ত্রাসী গ্যারিসন। আগামী ২৫ বছরের মধ্যে এই অবৈধ রাষ্ট্রটির কোনো অস্তিত্ব এই অঞ্চলে থাকবে না।"
পারমাণবিক অস্ত্র ও ইসলাম: আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও তিনি তার ধর্মীয় ফতোয়ায় অটল ছিলেন: "আমরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা ব্যবহার করি না কারণ আমাদের ধর্ম এটাকে নিষিদ্ধ করেছে। আমাদের শক্তি আমাদের বোমায় নয়, জনগণের ঈমানের মধ্যে।"
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ও আঞ্চলিক প্রভাব
খামেনেইর শাসনামলে ইরান কেবল টিকে থাকেনি, বরং আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তার নেতৃত্বে গঠিত ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধের অক্ষ আজ লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসকে (IRGC) তিনি এমন এক সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছেন যা সরাসরি তার কাছে দায়বদ্ধ।
ধর্মীয় পণ্ডিত ও সাহিত্যের অনুরাগী এক রাষ্ট্রনায়ক
কঠোর প্রশাসক এবং ধর্মীয় নেতার বাইরেও খামেনেইর একটি ভিন্ন সত্তা রয়েছে। তিনি ফারসি সাহিত্যের একনিষ্ঠ অনুরাগী এবং শৌখিন কবি। ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজারেবল’ থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত ধ্রুপদী সাহিত্য তার নখদর্পণে। তিনি একজন দক্ষ কোরআন তেলাওয়াতকারী এবং ধর্মীয় পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিলো। তিনি প্রায়ই তরুণদের বলতেন, ‘ভবিষ্যৎ তোমাদের হাতে। তোমরা যদি জ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে বিশ্বকে ছাড়িয়ে যেতে পারো, তবে কোনো পরাশক্তি তোমাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না।’
এক আপসহীন যোদ্ধার মহাকাব্যের সমাপ্তি
দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরানের নাটাই শক্ত হাতে ধরে রাখার পর, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল-আমেরিকার যৌথ হামলায় তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। তার এই দীর্ঘ সফর কেবল ইরানের ইতিহাস নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে স্থায়ীভাবে প্রভাবিত করে গেছে। তিনি যেমন একদিকে আধ্যাত্মিক গুরু, অন্যদিকে তেমনই ছিলেন এক অকুতোভয় রণকৌশলী। তেহরানের এই লৌহমানবের শাহাদাৎ বরণের মাধ্যমে এক আপসহীন যোদ্ধার মহাকাব্যের সমাপ্তি ঘটলো।