সাকিল সৈকত
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬ বিকাল ০৪:২১:৩৭
পদ্মার কান্না ফারাক্কা: প্রয়োজন পানির ন্যায্য হিস্যা
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বাংলার মানুষের কৃষি, মৎস্য ও জীবিকার ভিত্তি গড়েছে। কিন্তু সেই ভিত্তিমূলে আঘাত হেনেছে ফারাক্কা বাঁধ দশকের পর দশক। ষাটের দশকের শুরু থেকে পচাত্তর অবধি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর উপর নির্মিত এই বাঁধ বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনে যে ক্ষত তৈরি করেছে তা শুকায়নি আজও। সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ২ হাজার ২৪০ মিটার দীর্ঘ এই বাঁধ নির্মিত হয়। ভারতের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল-গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা ফেরানো। তবে এর ফলে একতরফাভাবে গঙ্গা বা পদ্মার পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয় ও পানিসংকট সৃষ্টি হয়। এটি পদ্মা ও পদ্মাপাড়ের মানুষের কান্না। এই সংকট মোকাবিলায় এবং পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা সময়ের প্রধান দাবি। এটি ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্য এটি অস্তিত্বগত সংকটের কারণ।
বাঁধ চালুর আগে থেকেই বাংলাদেশের আপত্তি ছিলো। ১৯৭২-৭৪ সালের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়েছে। তবে ভারত একতরফাভাবে এই বাঁধ চালু করে। এই বাস্তবতায় ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে রাজশাহী থেকে কানসাটের পদ্মাতীর পর্যন্ত ঐতিহাসিক লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ৬৪ কিলোমিটারের সেই পদযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন লক্ষাধিক মানুষ। সেই সময় ভাসানীর বয়স ছিল নব্বই বছরের বেশি এবং তিনি সদ্য হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। তবুও মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি লক্ষ মানুষের সামনে এগিয়ে হেঁটেছেন। মিছিলের শেষে কানসাট প্রান্তরে বিশাল জনসভায় তিনি ঘোষণা দিয়েছেন-ভারত যদি ফারাক্কা সমস্যার সমাধান না করে, তাহলে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু হবে।
ভাসানী বুঝেছিলেন- দুর্বল রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর কূটনৈতিক টেবিলে ততক্ষণই শোনা যায় যতক্ষণ জনগণ পথে নেমে সেই কণ্ঠে জোর দেয়। লংমার্চ রাষ্ট্রীয় দাবিকে গণদাবিতে রূপান্তরিত করেছিলো। এটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এটি ভারতের উপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এবং আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গঙ্গার প্রবাহ শুকনো মৌসুমে নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের ১,২১,৪১০ হেক্টর জমির সেচব্যবস্থা হুমকিতের পড়ে। এতে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠ শুকিয়ে গেছে, পদ্মার বুকে জেগেছে অগণিত চর। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে যে পরিমাণ ফসল নষ্ট হয়, তা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। ফারাক্কা-পরবর্তী সময়কালে ভূগর্ভস্থ পানির গতিপথ ধীরে ধীরে দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে। গঙ্গা নদী বর্তমানে বছরের প্রায় নয় মাস আশপাশের ভূগর্ভস্থ জলস্তর থেকে পানি সংগ্রহ করছে। ফলে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে। নদী ও জলাভূমিতে মিনারেল ও নিউট্রিয়েন্ট কমে যাওয়ায় ফাইটোপ্লাকটন উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০%। ফাইটোপ্লাকটন খাদ্যশৃঙ্খলের প্রথম ধাপ হওয়ায় এর ক্ষতি মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে।
পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের সংগমস্থল আরিচাঘাটে করা জরিপ অনুযায়ী বর্তমান মৎস্য উৎপাদন ৩৫ বছর আগের তুলনায় মাত্র ২৫%-এ নেমে এসেছে।
১৯৮৩ সালেই লবণাক্ততার রেখা কামারখালির প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে এবং পসুর নদীর মোহনা থেকে ২৪০ কিলোমিটার ভেতরে পৌঁছে গিয়েছিল। সুন্দরবনে মিষ্টি পানির অভাবে লবণাক্ততা ক্রমেই বাড়ছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলছে।
দীর্ঘ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছরমেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট পানির হিস্যা নির্ধারিত হয়। তবে চুক্তি বাস্তবায়নে দুর্বলতা ও চুক্তির গ্যারান্টি নিয়ে প্রশ্ন শুরু থেকেই ছিল। এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। অথচ নতুন চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো কোনো দৃশ্যমান আলোচনা শুরু হয়নি। এই নিষ্ক্রিয়তা অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সাল থেকে আবারও একতরফা পানি ব্যবস্থাপনার শিকার হতে পারে বাংলাদেশ।
সম্প্রতি সরকারের তৃতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। যার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। মূলত ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির যে সংকট দেখা দেয়, তা থেকে কিছুটা রেহাই পেতেই প্রকল্পটির অনুমোদন করা হয়েছে। কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পদ্মা ব্যারেজ নামে প্রকল্পটি অবশেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে বলে জানা যায়। সংরক্ষিত পানি দিয়ে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে।
এর আগে ২০২৫ সালের ২০ জুন বাংলাদেশ জাতিসংঘের Transboundary Watercourses and International Lakes কনভেনশনে যোগ দেয়। এটি বিশ্বের একমাত্র বৈশ্বিক ও আইনিভাবে বাধ্যতামূলক পানি-বিধিমালা। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ আগে এই কনভেনশনে ছিল না। আন্তর্জাতিক জলপথ আইনের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন আইনগতভাবে অনেক শক্তিশালী হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের 'Hydro-hegemony' তত্ত্ব অনুযায়ী, শক্তিশালী উজানের রাষ্ট্র প্রায়ই প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক নদীতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ফারাক্কা বাঁধ এই তত্ত্বের একটি পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ। ভারত উজানের সুবিধাজনক অবস্থান ব্যবহার করে একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে।
আন্তর্জাতিক নদী আইনের 'equitable and reasonable use' নীতি অনুযায়ী, আন্তসীমান্ত নদীতে প্রতিটি রাষ্ট্রের ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহারের অধিকার আছে। ভাটির দেশের কৃষি, জনজীবন ও পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব না ফেলে উজানের দেশ পানি ব্যবহার করতে পারে — এটাই আন্তর্জাতিক আইনের ভাষ্য। ফারাক্কার বাস্তবতা এই নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
শুধু ফারাক্কা নয়, তিস্তা, মনু, মহানন্দাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীকে একটি সামগ্রিক নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। ইউরোপের দানিউব কমিশন, আফ্রিকার নাইল বেসিন উদ্যোগ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেকং রিভার কমিশন দেখিয়ে দিয়েছে — পানিবণ্টনকে শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখলে সমাধান সম্ভব। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশকে একত্রিত করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে উত্থাপন করা উচিত।
১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে যে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তা কেবল একটি রাজনৈতিক মিছিল না, ছিল একটি জাতির আত্মসম্মানের ঘোষণা। রাজশাহী থেকে কানসাটের পদ্মাতীর পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের সেই পদযাত্রা প্রমাণ করেছিল একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রও তার ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে মাথা নত করতে প্রস্তুত নয়। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভারত একতরফাভাবে পদ্মার পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠ শুকিয়ে যায়, পদ্মার বুকে জেগে ওঠে চর, মৎস্যজীবীদের জালে মাছ ওঠা বন্ধ হয়। এই সংকট শুধু পরিবেশগত না এটা সার্বভৌমত্বেরও সংকট। প্রতিবেশী রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নদীর উপর একতরফা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনকে জিম্মি করে রেখেছে।
ভাসানীর লংমার্চ আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে নিয়ে আসার একটি সাহসী প্রয়াস ছিল। কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে দুর্বল রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর ততক্ষণই শোনা যায়, যতক্ষণ জনগণ পথে নেমে সেই কণ্ঠে জোর দেয়। লংমার্চ ছিল গণ-কূটনীতির এক নজির। রাষ্ট্রীয় দাবিকে গণদাবিতে রূপান্তরের এক বিপ্লবী পদ্ধতি। ভাসানীর পায়ে হাঁটা শুধু প্রতীকী ছিল না; ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঘোষণা।
ফারাক্কা লংমার্চের চেতনা আজও প্রাসঙ্গিক, বরং আরও বেশি। পানি-বণ্টন চুক্তি হয়েছে, তবু তিস্তার বুক শুকনো। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা এখনও অনিশ্চিত। বন্দর, ট্রানজিট ও সীমান্ত-বাণিজ্যের প্রশ্নে অসম সম্পর্কের ছায়া এখনও দীর্ঘ। এই প্রেক্ষাপটে ফারাক্কার শিক্ষা হলো- জাতীয় অধিকার আদায়ে কেবল সরকারি পর্যায়ের দরকষাকষি যথেষ্ট নয়; দরকার গণ-জাগরণ, সংগঠিত গণচাপ।
ফারাক্কা লংমার্চ এই সত্যও প্রতিষ্ঠা করেছিল জাতীয় অধিকারের প্রশ্নটি কেবল ভূখণ্ড বা সম্পদের প্রশ্ন নয় এটি মর্যাদার প্রশ্ন। সেই চেতনাকে লালন করা মানে কেবল ইতিহাস স্মরণ করা নয়-মানে বর্তমানের অসাম্যের বিরুদ্ধেও সমান সাহসে দাঁড়ানো।
যতদিন আন্তর্জাতিক নদীতে ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত না হবে, যতদিন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছোট রাষ্ট্রগুলো চাপের মুখে তাদের সার্বভৌম অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে-ততদিন মওলানা ভাসানীর সেই পদচিহ্নগুলো পথ দেখাবে।
লেখক: নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী