অজিত কুমার দাশ, ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
প্রকাশ : ৭ মার্চ ২০২৬ রাত ০৭:১৭:০২
১৭ মার্চ পণতীর্থে মহাবারুণী গঙ্গাস্নান ভক্তদের আগমনে মুখর হবে শ্রী শ্রী অদ্বৈত জন্মধাম
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান পণতীর্থে আগামী ১৭ মার্চ (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী মহাবারুণী গঙ্গাস্নান উৎসব। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার রাজারগাঁও (লাউড়–নবগ্রাম) এলাকায় অবস্থিত শ্রী শ্রী অদ্বৈত জন্মধাম প্রাঙ্গণে এই মহাপুণ্য স্নান উপলক্ষে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, “সব তীর্থ বারবার, পণতীর্থ একবার”—এই প্রবাদবাক্য থেকেই পণতীর্থের মাহাত্ম্য ও গুরুত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রতিবছর চৈত্র মাসের নির্দিষ্ট তিথিতে অনুষ্ঠিত মহাবারুণী গঙ্গাস্নানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অসংখ্য ভক্ত-তীর্থযাত্রী অংশগ্রহণ করেন। ফলে এ সময় পণতীর্থ এলাকা পরিণত হয় এক মহামিলনমেলায়।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলা ১৪৩২ সনের ২ চৈত্র, খ্রিস্টাব্দ ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ মঙ্গলবার ভোর ৫টা ৫৩ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড থেকে সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড পর্যন্ত শতভিষা নক্ষত্রে মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে এই পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত হবে। ধর্মীয় শাস্ত্রমতে, এই শুভক্ষণে পণতীর্থের জলে স্নান করলে বহু শত সূর্যগ্রহণকালের স্নানের সমতুল্য পুণ্য লাভ হয় বলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস।
পুণ্যস্নান উপলক্ষে তীর্থস্থানে পূজা-অর্চনা, নামসংকীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা, প্রসাদ বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। ভোর থেকেই ভক্তরা নদীতীরে সমবেত হয়ে মন্ত্রোচ্চারণ ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে পবিত্র গঙ্গাজলে স্নান করবেন। স্নান শেষে ভক্তরা দেবতার উদ্দেশ্যে পূজা-অর্চনা, দান-ধ্যান ও প্রার্থনায় অংশ নেবেন।
উৎসবটি সফলভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে শ্রী শ্রী অদ্বৈত জন্মধাম কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটি নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগত তীর্থযাত্রীদের জন্য প্রসাদের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ভক্তদের সার্বিক সহায়তায় স্বেচ্ছাসেবক দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে।
পণতীর্থের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, এটি মহান বৈষ্ণব সাধক শ্রী অদ্বৈত আচার্যের জন্মভূমি হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। এ কারণে এই তীর্থস্থান ভক্তদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তির স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
প্রতিবছর মহাবারুণী গঙ্গাস্নানকে ঘিরে পণতীর্থ এলাকায় ভক্তদের ঢল নামে। ধর্মীয় পরিবেশে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নদীতীর জুড়ে ভক্তদের স্নান, প্রার্থনা, নামসংকীর্তন এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়।
পণতীর্থে যাতায়াতের জন্য নির্ধারিত সড়কপথ হিসেবে সুনামগঞ্জ থেকে আব্দুজ জহুর সেতু হয়ে চালবন্দ পয়েন্ট, পলাশ বাজার, ধনপুর বাজার, মমিন বাজার, আনন্দ বাজার ও বিন্নাকুলী হয়ে পণতীর্থে পৌঁছানো যাবে। ফেরার পথে পণতীর্থ থেকে লাউড়েরগড়, স্বরূপগঞ্জ, চিনাকান্দি, বাঘবেড় হয়ে চালবন্দ পয়েন্ট হয়ে সুনামগঞ্জে ফেরা যাবে।
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে দেশ-বিদেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তদের এই মহাপুণ্য গঙ্গাস্নান উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ধর্মীয় নেতাদের মতে, পণতীর্থের মহাবারুণী গঙ্গাস্নান শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি সনাতন ধর্মের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, ভক্তি ও মানবিক মিলনের এক মহোৎসব। প্রতিবছর এই পুণ্যতীর্থে লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্য আজও মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে।