৬৭ বছরের ঐতিহ্যে স্থায়ী তালা, কর্মহীন আড়াই শতাধিক শ্রমিক; পুনরায় চালু করতে প্রয়োজন ১০ কোটি টাকা
রুহুল আমিন কিবরিয়া, বগুড়া জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৮ নভেম্বর ২০২৬ সকাল ১১:৩৫:২৭
গ্যাসের বাড়তি দামে নিভল দেশের প্রথম সিরামিক কারখানা ‘তাজমা’
দেশের সিরামিক শিল্পের পথিকৃৎ বগুড়ার তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে স্থায়ীভাবে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মূলধন সংকট, ঋণের চাপ ও পরিবেশগত জটিলতায় ৬৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ২৫০ শ্রমিক-কর্মচারী। তাঁদের বড় একটি অংশ নারী। একসময় যে কারখানা দেশের সিরামিক শিল্পের যাত্রায় পথ দেখিয়েছিল, এখন সেখানে পড়ে আছে উৎপাদনের যন্ত্রপাতি আর শ্রমিকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
গত ২২ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান শেয়ারমালিকদের সর্বসম্মতিক্রমে কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, নানা প্রতিকূলতায় এর আগেও কয়েকবার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তবে এবার স্থায়ীভাবেই কারখানাটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
১৯৫৯ সালে জাপানি প্রতিষ্ঠান নিচিম্যান ট্রেডিং কোম্পানির কারিগরি সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয় তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ। পাকিস্তান আমলে বগুড়ায় এসে বিড়ি ব্যবসা শুরু করেন উদ্যোক্তা আব্দুল জব্বার। সেই ব্যবসার পুঁজি থেকেই সিরামিক কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন তিনি। প্রতিষ্ঠার সময় জাপানি প্রকৌশলীরা বগুড়ায় অবস্থান করে কারখানার পরিচালনা ও উৎপাদন কার্যক্রমে সহায়তা করেন।
শুরুর দিকে ফার্নেস অয়েল দিয়ে চলত কারখানার উৎপাদন। তখন শ্রমিক ছিলেন মাত্র ৫০ জন। সময়ের সঙ্গে বাড়ে উৎপাদন ও পণ্যের চাহিদা। একপর্যায়ে শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২৫০ জনে। তাঁদের অর্ধেকের বেশি নারী। অধিকাংশই দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক।
গ্যাসের দামেই বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান জানান, শুরুতে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার ৫০০ লিটার ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হতো। এতে দৈনিক ব্যয় ছিল প্রায় ৪৮ হাজার ৭৫৯ টাকা। মাসে জ্বালানি খরচ দাঁড়াত প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা।
পরবর্তী সময়ে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার পর জ্বালানি ব্যয় বেড়ে মাসে প্রায় ১৯ লাখ টাকা হয়। তবে গ্যাসে উৎপাদিত পণ্যের মান ভালো হওয়ায় বাজারে চাহিদাও ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর মাসিক জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৪০ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ব্যয় বাড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা। এতে আর্থিক সংকট তীব্র হয়। দেড় বছর আগে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
তিনি আরও জানান, কারখানার জমি রূপালী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে প্রায় তিন কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গ্যাস বিল বাবদ প্রায় ৪০ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।
কারখানা বন্ধ, অনিশ্চিত শ্রমিকদের জীবন
কারখানা বন্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের জীবনে। তাঁদের একজন ধুনট উপজেলার ছালেহা বেওয়া। স্বামী মারা যাওয়ার পর ১৩ বছর ধরে এ কারখানায় দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেছেন তিনি। কারখানায় কাজ করেই মেয়ে আকলিমা খাতুনকে সরকারি আজিজুল হক কলেজে অনার্সে পড়াচ্ছিলেন।
ছালেহা বেওয়া বলেন, ‘আমরা দৈনিক মজুরিতে কাজ করতাম। কারখানা বন্ধ, তাই এখন মজুরিরও কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
প্রায় ১০ বছর ধরে কারখানায় কাজ করা সেফালী খাতুনের অবস্থাও করুণ। তাঁর স্বামীর দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক নয়। এক ছেলে ও চার মেয়েসহ ছয় সদস্যের সংসারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। কারখানা বন্ধ হলেও মাঝেমধ্যে এসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন তিনি।
সেফালী খাতুন বলেন, ‘সংসারের পুরো দায়িত্ব আমার ওপর। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর খুব কষ্টে দিন কাটছে। মাঝেমধ্যে এখানে এসে কিছু কাজ করি।’
অন্যদিকে, কারখানার টেকনিক্যাল শাখায় ১৯ বছর ধরে কাজ করছেন আমিনুল ইসলাম। এখনো তিনি কারখানায় আসেন। তবে উৎপাদন নেই। অলস পড়ে থাকা যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করাই এখন তাঁর কাজ।
জনবসতি ও পরিবেশগত জটিলতা
কারখানা বন্ধের আরেকটি কারণ হিসেবে পরিবেশগত জটিলতার কথা জানিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠার সময় এলাকাটি ছিল প্রায় জনমানবশূন্য। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেখানে গড়ে উঠেছে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। এ অবস্থায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বর্তমান স্থানে পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পুনরায় চালু করতে প্রয়োজন ১০ কোটি টাকা
তাজমা সিরামিক নতুন করে চালু করতে হলে প্রথমেই কারখানাটি অন্যত্র স্থানান্তর করতে হবে বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান। তাঁর মতে, নতুন স্থানে কারখানা স্থাপন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং অন্তত ১০ কোটি টাকা মূলধন প্রয়োজন। এসব নিশ্চিত করা গেলে আবারও উৎপাদনে ফেরা সম্ভব।
তিনি বলেন, নতুন যন্ত্রপাতি দিয়ে উৎপাদন শুরু করা গেলে পণ্যের মান উন্নত হবে। বগুড়ায় শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলক কম হওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগও রয়েছে।
শিল্পের বাজার বাড়ছে, বন্ধ হচ্ছে পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমএসএম আতিকুর রহমান (বাদল সরকার) বলেন, দেশে বর্তমানে সিরামিক শিল্পের বাজার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার। বগুড়ায় রয়েছে আটটি সিরামিক কারখানা। এমন সম্ভাবনাময় শিল্প খাতে দেশের প্রথম দিকের প্রতিষ্ঠান তাজমা সিরামিক বন্ধ হয়ে যাওয়া দুঃখজনক।
তাঁর বক্তব্যে ব্যাংকঋণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তবে কারখানাটি বন্ধ হওয়ার পেছনে ব্যাংকের ভূমিকা ও ঋণসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
৬৭ বছরের ইতিহাসে তাজমা সিরামিক শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, দেশের সিরামিক শিল্পের শুরুর ইতিহাসেরও অংশ। গ্যাসের বাড়তি দাম, মূলধন সংকট ও পরিবেশগত জটিলতায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামনে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—শিল্পের জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা এবং কর্মহীন শ্রমিকদের পুনর্বাসনে দায়িত্ব নেবে কে?