মনজু বিজয় চৌধুরী, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৬ মে ২০২৬ বিকাল ০৩:৫০:৫৮
পাম্প বিকল, হাওরে ফসল বিপর্যয়: ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি
গত কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার কাউয়াদিঘি ও হাওরাঞ্চলে দ্রুত পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে হাওরে চাষ করা বোরো ধান রক্ষায় কৃষকেরা প্রকৃতির সঙ্গে যেন যুদ্ধ করে যাচ্ছেন।
হাওরাঞ্চলে বোরো ধান এখন শুধু ফসল নয়, অনেক কৃষকের কাছে এটি ডুবে যাওয়া স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার বিস্তীর্ণ হাওর তলিয়ে গেছে। ফলে জমিতে থাকা ধান কাটার আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আবার কেটে রাখা ধানও পানিতে পচে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে হাওর এলাকায় রয়েছে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। সদর, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। রাজনগরের মনু প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউস যথাযথভাবে পানি নিষ্কাশন না করায় হাওরে পানি জমে থাকছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে সারাদেশে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলেও মৌলভীবাজারে এখনো তা শুরু হয়নি। বৈরী আবহাওয়া ও পানিতে নিমজ্জিত ফসল এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এতে কৃষকের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। চলতি বছর জেলায় ৬ হাজার ৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাদিপুর গ্রামের কৃষাণী জবা রানী বিশ্বাস জানান, ২৫ বিঘা জমির ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ ও সংসার চালানোর স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু বন্যার পানিতে সেই স্বপ্ন ভেসে গেছে। তিনি বলেন, “দুই বিঘা জমির ধান তুলেছি, কিন্তু শুকাতে পারিনি। সব পচে গেছে। এখন পচা ধান সেদ্ধ করে খেতে হচ্ছে।”
শেওয়াইজুড়ী এলাকার কৃষক বাবর মিয়া বলেন, “পাম্প ঠিকমতো চললে জমি ডুবে থাকত না। এখন প্রতি বিঘায় প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ করে পানির নিচ থেকে ধান তুলতে হচ্ছে।”
মিরপুর এলাকার কৃষক জুনেদ মিয়া জানান, তার ১০ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র ১ বিঘার ধান তুলতে পেরেছেন, বাকি জমি এক সপ্তাহ ধরে পানির নিচে রয়েছে। অধিকাংশ কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করায় ফসল নষ্ট হওয়ায় তারা ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
ক্ষতির পাশাপাশি বাজারে ধানের দামও কমে গেছে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ধানের দাম ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ জানান, মার্চের ১০ তারিখ থেকে জেলায় ধারাবাহিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ কারণে হাওরাঞ্চলে পানি জমেছে। তবে সুইচ গেটগুলো খোলা রাখা হয়েছে এবং পাম্প হাউসগুলো নিয়মিত চালু রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে এবং প্রায় ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বলেও তিনি জানান।