শামীম আহমদ মতলব, উত্তর (চাঁদপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুপুর ০২:৪৫:১৩
একদিনেও সন্ধান মেলেনি রবিনের, স্বামীকে ফিরে পেতে ঘাটে স্ত্রীর আহাজারি
আমার এহন কি অইবো, আমার মাইয়্যা আয়ান কে দেখবো? কেউ কি সাথে সাথে উঠাইতে পারলেন না? স্বামীকে হারানোর শঙ্কায় এভাবেই আহাজারি করছেন নাসরিন আক্তার।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল লঞ্চঘাটে মেঘনা নদীতে পড়ে নিখোঁজের একদিন পার হলেও সন্ধান মেলেনি রবিনের। স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশায় এখনো ঘাটে অপেক্ষা করছেন স্ত্রী নাসরিন। একমাত্র সন্তান সাড়ে চার বছরের আয়ানকে নিয়ে কী হবে এ নিয়েও ভেঙে পড়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুরগামী মুকবিল-২ লঞ্চটি ষাটনল লঞ্চঘাটে যাত্রী নামাচ্ছিল। এ সময় আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী রবিন লঞ্চ থেকে নামেন। পরে নিজের ব্যাগ লঞ্চে রেখে যাওয়ার কথা মনে পড়ে আবার লঞ্চে ওঠেন। পরে ফের লঞ্চ থেকে নামার সময় লঞ্চটি পেছনের দিকে চালিয়ে দেওয়া হলে ঘাটে লাফ দিয়ে নামার চেষ্টা করেন রবিন। এ সময় তিনি মেঘনা নদীতে পড়ে নিখোঁজ হন।
ঘটনার পর মুকবিল-২ লঞ্চটি দ্রুত মোহনপুর লঞ্চঘাটের দিকে চলে যায়। পরে মোহনপুর নৌ-পুলিশ লঞ্চটি আটক করে। একই সঙ্গে লঞ্চের মাস্টার ও গ্রিজারকেও আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিরা হলেন মতলব উত্তরের তাতুয়া গ্রামের লঞ্চ মাস্টার মনির হোসেন (৫০) এবং দাউদকান্দির বালিয়াধন গ্রামের গ্রিজার মো. সুমন মিয়া (২৭)।
নিখোঁজের খবর পেয়ে বেলতলী নৌ-পুলিশ, মোহনপুর নৌ-পুলিশ ও মতলব উত্তর থানা পুলিশের সদস্যরা স্থানীয়দের নিয়ে নদীতে তল্লাশি শুরু করেন। পরে চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
এদিকে, নদীতে ভাসমান অবস্থায় রবিনের ব্যাগ পাওয়া যায়। ব্যাগের ভেতরে থাকা মোবাইল ফোনের সিমকার্ড অন্য একটি ফোনে দিয়ে বেলতলী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি থেকে যোগাযোগ করা হয়। ফোনটি রিসিভ করেন রবিনের স্ত্রী নাসরিন আক্তার। তিনি জানান, নম্বরটি তার স্বামী রবিনের। এভাবেই শনাক্ত হয় নদীতে নিখোঁজ ওই যুবকের পরিচয়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, রবিনের জন্মস্থান শরীয়তপুর। তিনি নারায়ণগঞ্জে মা-বাবার সঙ্গে বসবাস করতেন। তার শ্বশুরবাড়ি মতলব উত্তর উপজেলার বাগানবাড়ী ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামের মোল্লা বাড়িতে। রবিন ও নাসরিন দম্পতির সাড়ে চার বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
স্বামীর নিখোঁজের খবর পেয়ে নাসরিন ছুটে আসেন ষাটনল লঞ্চঘাটে। এরপর থেকে স্বামীর সন্ধানে ঘাটেই অপেক্ষা করছেন তিনি। কখনো নদীর দিকে তাকিয়ে, কখনো আহাজারি করে স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন।
ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি। তিনি নৌ-পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সঙ্গে কথা বলে উদ্ধার কার্যক্রমের বিষয়ে খোঁজ নেন।
এ ঘটনায় নিখোঁজ রবিনের স্ত্রী নাসরিন আক্তার বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়েরের জন্য এজাহার দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বেলতলী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মোজাম্মেল হক পিপিএম। মোজাম্মেল হক পিপিএম বলেন, নিখোঁজ রবিনের স্ত্রী বাদী হয়ে মামলা দায়েরের জন্য এজাহার দিয়েছেন। বিষয়টি যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান চালালেও রবিনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। শনিবারও মেঘনা নদীতে তার সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। একদিন পেরিয়ে গেলেও স্বামীর অপেক্ষায় ষাটনল ঘাটে নাসরিন। আর ছোট্ট আয়ান অপেক্ষা করছে বাবার ফেরার আশায়। রবিনকে জীবিত উদ্ধারের আশায় পরিবার ও স্বজনরা এখনো নদীর পাড়ে অপেক্ষা করছেন।