শামীম আহমেদ জয়, মতলব (চাঁদপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬ রাত ০৬:৪০:০৫
নামমাত্র কমিউনিটি ক্লিনিক, ওষুধ-জনবল সংকটে সেবাবঞ্চিত ৪ লাখ মানুষ
১৯৯৮ সালে গ্রামের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম চালু হয়। পরে ২০০৯ সালের পর দেশব্যাপী এ কার্যক্রমের ব্যাপক সম্প্রসারণ হলেও বর্তমানে মতলব উত্তরের অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিক নানা সংকটে কার্যকারিতা হারাতে বসেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, মতলব উত্তর উপজেলায় মোট ৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে ছয় দিন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি সপ্তাহে তিন দিন স্বাস্থ্য সহকারী এবং তিন দিন পরিবার কল্যাণ সহকারী সেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্লিনিকে সিএইচসিপি ছাড়া অন্য কোনো কর্মীকে দেখা যায় না। এসব ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ৪ লাখ মানুষের নিয়মিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব, জনবল-সংকট ও অনিয়মিত কার্যক্রমের কারণে সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩২ ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত থাকার কথা। কিন্তু অধিকাংশ ক্লিনিকে প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল (মেট্রিল) ও ওরস্যালাইন ছাড়া তেমন কোনো ওষুধ নেই। অনেক ক্লিনিকে এসব ওষুধও পর্যাপ্ত নয়। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ছাড়াই ফিরে যেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, শিশু ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্লিনিক নির্ধারিত সময়ে খোলা হয় না, আবার সময় শেষ হওয়ার আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওষুধ-সংকটের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনিয়মিত উপস্থিতিও সেবাব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে উদ্বেগজনক চিত্র। মধ্য ইসলামাবাদ কমিউনিটি ক্লিনিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি উপস্থিত থাকলেও দুপুর পর্যন্ত কোনো রোগী আসেননি। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় মানুষ এখন আর ক্লিনিকে আসতে আগ্রহী নয়।
অন্যদিকে, পূর্ব ফতেপুর ইউনিয়নের এনায়েতনগর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে প্রায়ই ক্লিনিক বন্ধ থাকে। ঝড়-বৃষ্টির অজুহাতে টানা কয়েক দিন ক্লিনিক বন্ধ রাখা হয়। খুললেও ওষুধ না থাকার কথা বলে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ইন্দুরিয়া, এনায়েতনগর, ফতেপুর, ফরাজিকান্দি, লুধুয়া, এখলাসপুর, মোহনপুর ও বাগানবাড়ি এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিকেও একই চিত্র দেখা গেছে।
ফরাজীকান্দি গ্রামের সেবাগ্রহীতা সাবিনা আক্তার বলেন, “আগে নিয়মিত এখান থেকে চিকিৎসা ও ওষুধ পেতাম। গত এক বছর ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। কোনো অ্যান্টিবায়োটিকও নেই। তাই অনেকেই এখন আর কমিউনিটি ক্লিনিকে আসে না।”
সুজাতপুর গ্রামের বাসিন্দা ফাতিহা বেগম বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে আলসারের রোগী। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিয়মিত ওষুধ কিনতে পারি না। চার মাস ধরে ক্লিনিকে এসেও কোনো ওষুধ পাইনি। সরকারি ক্লিনিক থেকেও যদি না পাই, তাহলে আমরা কোথায় যাব?”
স্থানীয় মসজিদের ইমাম মেহেদী হাসান বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এখানে ওষুধের সংকট চলছে। আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এই ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ওষুধ না পেয়ে সবাই ফিরে যাচ্ছে।”
মধ্য ইসলামাবাদ কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি লাভলী আক্তার বলেন, “প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকলে রোগীরা উপকৃত হতেন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর চাপও কমত। কিন্তু ওষুধের অভাবে রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অনেক সময় আমাদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করেন।”
মতলব উত্তর সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুনুর রশিদ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের সংকট চলছে। গত চার মাসে মাত্র এক কার্টন ওষুধ পেয়েছি। আগে যেখানে ৩২ ধরনের ওষুধ থাকত, এখন পাচ্ছি মাত্র ২২ ধরনের। বিষয়টি বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দিয়েছেন।”
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাস বলেন, “প্রায় এক বছর ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের সংকট চলছে। তবে এখন থেকে প্রতি মাসে এক কার্টন করে ওষুধ সরবরাহ করা হবে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে রোগীরা আর বঞ্চিত হবেন না।”