মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬ রাত ১১:৪৯:২৪
মোংলায় হৃদয়বিদারক জানাজা, এক উঠানে ৯ লাশে শোকের মাতম
বিয়ের আনন্দ শেষে শোকের মিছিলে পরিণত হওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মোংলায় এক উঠানে পাশাপাশি শায়িত ৯টি লাশকে কেন্দ্র করে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো জনপদের আকাশ-বাতাস।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকাল থেকেই মোংলা পৌর শহরের সাত্তার লেনের একটি বাড়িতে মানুষের ঢল নামে। কয়েকদিন আগেও যেখানে ছিল বিয়ের আনন্দ, হাসি ও অতিথিদের কোলাহল—সেই বাড়ির উঠানেই এখন সারি সারি নিথর দেহ। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষজন কেউ লাশের পাশে বসে বিলাপ করছেন, কেউ নির্বাক দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন। পুরো এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে এক ভারী শোকের আবহ।
উঠানে রাখা হয় পৌর বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক, তার ছেলে, মেয়ে, পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনিদের মরদেহ। স্থানীয়দের ভাষ্য, মোংলার ইতিহাসে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেননি।
স্বজনরা জানান, আনন্দঘন পরিবেশে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে নববধূকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন তারা। মুহূর্তেই আনন্দের যাত্রা রূপ নেয় শোকের মিছিলে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে খুলনা ও বাগেরহাটের রামপাল এলাকা থেকে নিহতদের মরদেহ এনে সাত্তার লেনের বাড়িতে রাখা হয়। এরপর থেকেই বাড়িটির উঠান যেন শোকের সমুদ্রে পরিণত হয়।
অন্যদিকে নিহত নববধূ মারজিয়া আক্তার মিতু, তার বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগমের মরদেহ রাতেই নেওয়া হয় খুলনার কয়রায়। মাইক্রোবাসচালক নাঈম শেখের মরদেহ পৌঁছেছে বাগেরহাটের রামপালের সিঙ্গেরবুনিয়া এলাকায়।
স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পরিবারের ৯ জনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন আশরাফুল রহমান জনি। তিনি ছোট ভাই সাব্বিরের বিয়েতে পরিবারের সঙ্গে কয়রায় গিয়েছিলেন। ফেরার পথে পরিবারের সদস্যরা মাইক্রোবাসে উঠলেও তিনি মোটরসাইকেলে আসছিলেন বলে প্রাণে বেঁচে যান। তবে চোখের সামনে প্রিয়জনদের নিথর দেহ দেখতে পেয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। পরিবারের এই মর্মান্তিক ক্ষতির খবর শুনে অসাড় হয়ে পড়েছেন মা আঞ্জুমানয়ারা, আরেক ভাই সাদ্দাম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দুপুর ২টায় মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং হাজারো মানুষ অংশ নেন। পরে মোংলা পৌর কবরস্থানে একে একে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক আব্দুল বাতেন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাসান, রামপাল-মোংলা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. রেফাতুল ইসলাম, মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর রহমান শাহীন, পৌর বিএনপির সভাপতি জুলফিকার আলী, সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদারসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
এ সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ড. ফরিদুল ইসলাম গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, একটি পরিবারের এতগুলো প্রাণ একসঙ্গে ঝরে যাওয়া অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক।
এছাড়া বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাগেরহাট জেলা শাখার নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াদুদ, বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মনজুরুল হক রাহাত এবং মোংলা উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক কোহিনুর সরদার।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি পরিবারের আনন্দমুখর বিয়ের আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে গভীর শোকে। সারি সারি লাশ আর চারদিকে স্বজনদের বুকফাটা কান্না—এই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়, এক মুহূর্তের দুর্ঘটনায় কিভাবে একটি পরিবার প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।