জয়নুল আবেদীন, নিউজ এডিটর, চ্যানেল এস
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬ বিকাল ০৫:৪৩:১৪
মাথা উঁচু করে ফিরতে চায় শেখ হাসিনা, জনগণ কি মেনে নেবে?
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বৈধ মন্ত্রী। একদিন বীরের বেশে শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরন করবেন। জনগণ তাকে স্যালুট দিয়ে বরণ করে নেবে। তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ জানিয়েছিলেন, শুভেন্দু অধিকারীর যদি সত্যিই সাহস থাকে, তাহলে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দিতে পারেন। অবশ্য বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শুভেন্দুর এই বক্তব্যকে অযাচিত বলে আখ্যা দেন।
এবার শেখ হাসিনা নিজেই বললেন, মাথা উঁচু করে বাংলাদেশ ফিরবেন তিনি। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাতকারে দেশে ফিরে আসার ইঙ্গিত, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। দাবি করেন, অতীতে একাধিকবার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, আওয়ামী লীগকে বারবার ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু শেষ করা যায়নি। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে তাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে। তবে দ্রুতই দেশে ফিরে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন বলে আশা তার।
শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে, ক্ষমতার অপব্যবহার, দমন-পীড়ন এবং মানুষের বাকস্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার হরণের জন্য পাহাড় সম ক্ষোভ জন্ম হয় জনগণের মাঝে। বিন্দু বিন্দু সেই ক্ষোভ জমে একসময় গন বিস্ফোরণে রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরতে যে পথে হাঁটছিলেন, তার ফল পেয়েছেন শেখ হাসিনা, অনেকটা বাংলা প্রবাদ লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু হওয়ার মতো ঘটনা।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চড়া উত্তাপ ও পটপরিবর্তন নতুন কোন ঘটনা নয়। গণ অভ্যুত্থানের দুই বছরের মধ্যে আবারো সগৌরবে দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা। যদিও তার বিরুদ্ধে গণ অভূত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অসংখ্য মামলা রয়েছে। কয়েকটি মামলায় মৃত্যুদন্ডের রায়ও হয়েছে। এ অবস্থায় মাথা উঁচু করে তার ফেরাটা কতটা সহজ হবে? সেই পরিবেশও কি বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে? বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দীন আহমদ বলেছেন, আইনী প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনাকে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তাই যদি হয়, শেখ হাসিনার মাথা উঁচু করে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবসম্মত?
একটি দেশের জনগণ যখন রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা বিদায় করেন, তখন তাদের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের 'প্রত্যাবর্তন-প্রতিরোধ' দেওয়াল তৈরি হয়। জুলাই আন্দোলনে যে সহিংসতা, প্রাণহানির ঘটনা ঘটে তা দেশের মানুষের স্মৃতিতে এখনো দগদগে ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। তাই শেখ হাসিনার "মাথা উঁচু করে" ফেরার কথা তো দূরে থাক, বিচারের মুখোমুখি না হয়ে তাঁর স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তনও বর্তমান সময়টাতে এক প্রকার অসম্ভব বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
আওয়ামী লীগের সমর্থক, নেতা কর্মীরা শেখ হাসিনার ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে, কিন্তু নিরপেক্ষ ও সাধারণ জনগণের বড় একটি অংশের মনোভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, রাজনীতিতে অপরাধের শাস্তি না হলে জবাবদিহিতা তৈরি হয় না। তবে সুশীল সমাজের অনেকে মনে করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আবারো ফিরবে। দলের হাইকমান্ড থেকেও বারবার সেই আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ দেশের গণমানুষের দল। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলেও, হাজার হাজার নেতাকর্মী দেশে এখনও সক্রিয় রয়েছেন। দেশের ও জনগণের স্বার্থে দলটির আবার সংগঠিত হয়ে ফিরে আসা কেবল সময়ের ব্যাপার।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের ‘ফিরে আসা’ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। তাঁর মতে, দেশে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও বিতর্কিত পদক্ষেপের সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের আদর্শিক জায়গাটি আবার রাজনীতিতে দৃশ্যমান হচ্ছে। অন্যদিকে, আরেক সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দাবি, রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং মানুষের মধ্যে তাদের স্বৈরাচারী মনোভাব ও বিভ্রান্তির চর্চাই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে আওয়ামী লীগ।
বিশ্লেষকদের কারো কারো মতে, শেখ হাসিনা যদি ভবিষ্যতে দেশে ফেরেনও, তবে তা "মাথা উঁচু করে" বীরের বেশে হওয়ার সুযোগ বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষীণ। বরং আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর সম্ভাবনাই বেশি। তাদের মতে, শেখ হাসিনার ফেরার ইচ্ছা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু দেশের আমজনতা তাঁকে "ক্ষমা" বা "স্বাগত" জানানোর মুডে আছে কিনা সেই প্রশ্নটা সামনে আছে। গণ-আকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাথা উঁচু করে ফেরার চেষ্টা উল্টো আরও বড় গণ-বিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে, এমন শঙ্কাও রয়েছে।