নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬ দুপুর ০২:৩৯:৫৮
এয়ার ইন্ডিয়া ২২ হাজার কোটি রুপি লোকসানের মুখে
টাটা গোষ্ঠীর মালিকানাধীন এয়ার ইন্ডিয়া ২০২৬ সালের মার্চ মাসে শেষ হওয়া অর্থবছরে ২২,০০০ কোটি রুপি বা প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার লোকসান গুনেছে। সংস্থাটি কয়েক মাস আগে যে ১.৬ বিলিয়ন ডলার লোকসানের পূর্বাভাস দিয়েছিল, প্রকৃত চিত্র তার চেয়েও অনেক বেশি শোচনীয়।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোকসানের এই বিশাল বোঝা সামলাতে এয়ার ইন্ডিয়া এখন ফের তার মালিকদের কাছে জরুরি তহবিলের আবেদন জানিয়েছে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এয়ার ইন্ডিয়ার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা টাটা গ্রুপ এবং ২৫.১ শতাংশ শেয়ারের মালিক সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স—উভয় পক্ষই নতুন করে মূলধন বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, যে পরিমাণ অর্থের কথা ভাবা হচ্ছে তা এয়ার ইন্ডিয়ার প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে বিমান সংস্থাটিকে অর্থায়নের জন্য অতিরিক্ত অন্য কোনো উৎসের সন্ধান করতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতির ওপর টাটা গ্রুপের বড় ধরনের স্বার্থ জড়িত। সংবাদ সংস্থাটি গত ফেব্রুয়ারিতেই জানিয়েছিল, টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরনের তৃতীয় মেয়াদের অনুমোদন পাওয়ার অন্যতম শর্ত হলো এয়ার ইন্ডিয়ার লোকসান নিয়ন্ত্রণে আনা।
সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সও এখন এই লোকসানের আঁচ টের পাচ্ছে। ২০২৪ সালে তাদের ভারতীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভিস্তারাকে এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে একীভূত করার প এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিল সংস্থাটি। তবে এয়ার ইন্ডিয়ার শোচনীয় পারফরম্যান্সের কারণে এখন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের নিজস্ব মুনাফাতেও টান পড়েছে।
অথচ বছরের শুরুটা মন্দ ছিল না। ২০২৫ সালের এপ্রিলের শুরুর সপ্তাহগুলোতে এয়ার ইন্ডিয়া এমনকি পরিচালন মুনাফাও (অপারেটিং প্রফিট) করছিল। কিন্তু এরপর একের পর এক বিপর্যয় শুরু হওয়ায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান তাদের আকাশপথ ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বন্ধ করে দেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপগামী এয়ার ইন্ডিয়ার দূরপাল্লার ফ্লাইটগুলোকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথে চলাচল করতে হয়। বাড়তি সময়ের এই উড্ডয়নে জ্বালানি খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি কমেছে মুনাফার হার।
এরপর আসে জুন মাস—যা ছিল সংস্থাটির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ। এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিধ্বস্ত হয়ে ২৪০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এমন এক সময়ে এই ট্র্যাজেডিটি ঘটে যখন এয়ার ইন্ডিয়ার আর্থিক অবস্থা এমনিতেই নাজুক ছিল, আর এই পরিস্থিতিতে তারা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিদেশি অন্য যেকোনো বিমান সংস্থার তুলনায় এ অঞ্চলে এয়ার ইন্ডিয়ার ব্যবসার পরিধি অনেক বেশি; সংস্থাটির মোট সক্ষমতার ১৬ শতাংশই এই অঞ্চলকে ঘিরে। কিন্তু যুদ্ধাবস্থার কারণে এই বাজারের বড় একটি অংশ এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাগামী ফ্লাইটগুলোকে আবারও পথ পরিবর্তন করে ঘুরতি পথে চালাতে হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপল, যখন বাজারে এমনিতেই জেট ফুয়েলের (বিমানের জ্বালানি) দাম আকাশচুম্বী।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি। ভারতের ওপর তার আরোপিত শুল্ক এবং বিদেশি কর্মীদের ভিসার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে যাত্রী চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে, যা বিমান সংস্থাটির রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
একের পর এক এসব ধাক্কার সম্মিলিত প্রভাবে এয়ার ইন্ডিয়া তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ যেখানে পরিচালন ব্যয় ও আয়ের সমতা (ব্রেক-ইভেন) আনার কথা ছিল, আর্থিক বিপর্যয়ে তা এখন সুদূরপরাহত।
আর্থিক এই সংকটের মধ্যেই যুক্ত হয়েছে নেতৃত্বশূন্যতা। গত সপ্তাহে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্যাম্পবেল উইলসন ঘোষণা দিয়েছেন যে, চলতি বছরের শেষের দিকে তিনি পদত্যাগ করবেন। এর ফলে এমন এক কঠিন সময়ে এয়ার ইন্ডিয়া অভিভাবকহীন হতে যাচ্ছে, যখন প্রতিটি মুহূর্তই তাদের জন্য অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
পরিস্থিতি আরও বেগতিক করে তুলেছে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল অ্যাভিয়েশনের (ডিজিসিএ) সাম্প্রতিক বার্ষিক অডিট। এই নিরাপত্তা নিরীক্ষায় এয়ার ইন্ডিয়া সবার নিচে অবস্থান করছে। যে বিমান সংস্থাটি বহর সম্প্রসারণে বিশাল বিনিয়োগ করেছে এবং প্রবৃদ্ধির বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তাদের জন্য নিরাপত্তার এই নেতিবাচক রিপোর্ট বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র : আউটলুক বিজনেস।