নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬ রাত ১০:৪৭:১৮
মালয়েশিয়ায় ‘তুরাপ’ ঘিরে নতুন ঝড়: বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম স্থগিতের দাবি সাত এমপির
মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থার জন্য প্রস্তাবিত ইউনিভার্সাল রিক্রুটমেন্ট অ্যাডভান্সড প্ল্যাটফর্ম (তুরাপ) চালুর উদ্যোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটির স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আর্থিক কাঠামো এবং সরকারি অনুমোদন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে এর বাস্তবায়ন অবিলম্বে স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সাতজন সংসদ সদস্য (এমপি)।
সোমবার (২৯ জুন) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)-এর বিষয়ে উত্থাপিত সুশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নগুলোর সমাধান না করেই নতুন একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ উদ্বেগজনক।
এমপিরা প্রশ্ন তুলেছেন, মন্ত্রিসভা কি আনুষ্ঠানিকভাবে তুরাপ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে? যদি অনুমোদন দিয়ে থাকে, তাহলে কেন আবারও বেস্টিনেটকে বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আনা হচ্ছে—সেই বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তাদের মতে, তুরাপ কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি বিদেশি কর্মী নিয়োগ, নিয়োগকর্তার সঙ্গে সংযুক্তি, অভিবাসন প্রক্রিয়া, কর্মী স্থানান্তর, নিয়োগ ব্যয়, শ্রম অধিকার এবং লাখ লাখ কর্মীর ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন জনপরামর্শ ও পূর্ণ স্বচ্ছতা ছাড়া করা উচিত নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, তুরাপের ঘোষিত লক্ষ্য হলো দালালচক্রের প্রভাব কমিয়ে সরাসরি নিয়োগকর্তা ও কর্মীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং নিয়োগ ব্যয় হ্রাস করা। তবে শুধুমাত্র একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার নিশ্চিত হবে না। কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবে পুরোনো শোষণব্যবস্থাই নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
সংসদ সদস্যরা স্মরণ করিয়ে দেন, পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (পিএসি)-এর প্রতিবেদনে এফডব্লিউসিএমএস পরিচালনায় একাধিক গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ছয় বছরেরও বেশি সময় সরকার ও বেস্টিনেটের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই সিস্টেমটি পরিচালিত হয়েছে। এছাড়া সুপার অ্যাডমিন আইডির নিয়ন্ত্রণ, অননুমোদিত ব্যক্তির মাধ্যমে আবেদন অনুমোদন এবং অন্যান্য নিরাপত্তা দুর্বলতার বিষয়ও সেখানে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
একই সঙ্গে ২০২২ সালের অডিটর জেনারেলের প্রতিবেদনে এফডব্লিউসিএমএস ব্যবস্থাপনাকে অসন্তোষজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসব বিতর্কের মধ্যেই সরকার ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০৩১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বেস্টিনেটের সঙ্গে নতুন চুক্তি করে, যেখানে প্রতি বিদেশি কর্মীর জন্য নির্ধারিত ফি ১০০ রিঙ্গিত থেকে বাড়িয়ে ২১৫ রিঙ্গিত করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে একই প্রতিষ্ঠানের হাতে আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্ল্যাটফর্ম তুলে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনপ্রণেতারা।
তাদের দাবি, তুরাপ বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) অথবা স্বচ্ছ রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে হবে। শুধুমাত্র এফডব্লিউসিএমএস পরিচালনার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি দায়িত্ব দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বিবৃতিতে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, তুরাপ চালু হলে বিদেশি কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া উৎস দেশে নিয়োগ, নিয়োগকর্তার সঙ্গে সংযুক্তি, প্রবেশ অনুমোদন, পারমিট নবায়ন এবং কর্মীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে একচেটিয়া ব্যবসায়িক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হবে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এমপিরা বলেন, বেস্টিনেটের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ১২ বছরের চুক্তির আওতায় হতে পারে এবং প্রতি বিদেশি কর্মীর আবেদনে প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ৯৫০ রিঙ্গিত) পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। পাশাপাশি একজন কর্মীর এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ফি আরোপের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে। যদিও এসব শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবুও তা ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং কর্মীবান্ধব সংস্কারের প্রশ্নে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এমপিরা সরকারের কাছে আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দাবি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে তুরাপের মন্ত্রিসভা অনুমোদনের অবস্থা, বেস্টিনেটকে সরাসরি দায়িত্ব দেওয়ার ভিত্তি, উন্মুক্ত দরপত্র না হওয়ার কারণ, প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো, বিদেশি কর্মীদের তথ্যের মালিকানা ও নিরাপত্তা, এবং নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা।
তারা বলেন, মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থায় প্রকৃত সংস্কার জরুরি। অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, ঋণের বোঝা, দালালচক্রের শোষণ এবং প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়ার মতো অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। তবে সংস্কারের নামে বহু দালালের পরিবর্তে একটি শক্তিশালী বেসরকারি একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কোনো সমাধান হতে পারে না।
যৌথ বিবৃতিতে সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে, সংসদ ও জনগণের সামনে তুরাপ প্রকল্পের সব তথ্য প্রকাশ না করা পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন স্থগিত রাখা হোক। একই সঙ্গে প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া, ব্যয়ের কাঠামো, তথ্য সুরক্ষা, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামো এবং কর্মী সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন পেতালিং জয়ার এমপি লি চিয়ান চুং, সুবাংয়ের এমপি ওং চেন, ওয়াংসা মাজুর এমপি জাহির হাসান, বালিক পুলাউয়ের এমপি মুহাম্মদ বখতিয়ার ওয়ান চিক, আমপাংয়ের এমপি রোদজিয়াহ ইসমাইল, সুংগাই সিপুতের এমপি কেসাভান সুব্রামানিয়াম এবং গোপেংয়ের এমপি তান কার হিং।