নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬ সকাল ১০:৪৫:৩৪
যাকাত দিবেন যেভাবে
যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের ওপর। এই কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, জাকাত আদায় করা, হজ করা ও রমজান মাসে রোজা রাখা।
যাকাত শব্দের আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা ও প্রবৃদ্ধি। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে সম্পদ পবিত্র হয়, জাকাতদাতার আত্মা শুদ্ধ হয় এবং জাকাত প্রদানে সম্পদে বরকত হয়। জাকাত প্রদান না করলে হালাল বা বৈধ সম্পদও হারাম মিশ্রিত হয়ে যায়। হালাল উপার্জন, হালাল সম্পদ ও হালাল খাদ্য ব্যতীত নামাজ, রোজা, হজ কোনো ইবাদতই কবুল হয় না।
যাকাত ফরজ হয় স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক এমন মুসলিম নর-নারীর ওপর, যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর অতিবাহিত হবে। নিসাব হলো- নিত্যদিনের প্রয়োজন পূরণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বাদ দেওয়ার পর সাড়ে ৫২ তোলা পরিমাণ (৬১২ দশমিক ৩৬ গ্রাম) রূপা অথবা সাড়ে সাত তোলা (৮৭ দশমিক ৪৮ গ্রাম) পরিমাণ স্বর্ণ থাকা অথবা এর সমমূল্যের ব্যবসার মালের মালিক হওয়া।
বিনিময়যোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা, ট্রাভেলার্স চেক, ব্যাংক চেক, ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার, পোস্টাল অর্ডার, মানি অর্ডার, শেয়ার সার্টিফিকেট, কোম্পানি শেয়ার, ডিও লেটার, সঞ্চয়পত্র, সিকিউরিটি মানি, জামানত, প্রাইজ বন্ড, ট্রেজারি বন্ড ইত্যাদি; ব্যাংকে বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা আমানত; যেমন বিমা, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট, সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট, মেয়াদি সঞ্চয়, এফডিআর, ফিক্সড ডিপোজিট, পেনশন স্কিম ও প্রভিডেন্ট ফান্ড; ফেরত পাওয়ার যোগ্য প্রদত্ত ঋণ, ব্যবসার পণ্য ও মূল্যবান শোপিস বা মূল্যবান পাথর-হীরা, জহরত, মণিমাণিক্য-মুক্তা ইত্যাদি; শেয়ার সার্টিফিকেটের নামিক মূল্য ও বাজারদরের মধ্যে যেটি বেশি, সেটি হিসাব করতে হবে।
নিসাব পরিমাণ ও তদূর্ধ্ব সম্পদের মালিক তার জাকাতযোগ্য সব সম্পদের জাকাত প্রতিবছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ (৪০ ভাগের ১ ভাগ) হারে প্রদান করতে হবে। চান্দ্রবর্ষ ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে হয়, যেহেতু সৌরবর্ষ ৩৬৫ দিনে বা ৩৬৬ দিনে হয়, তাই সৌরবর্ষ অপেক্ষা চান্দ্রবর্ষ ১০ বা ১১ দিন কম। সৌরবর্ষ হিসেবে জাকাত প্রদান করতে চাইলে শতকরা ২ দশমিক ৫ শতাংশ এর পরিবর্তে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ দিতে হবে, অর্থাৎ মূল জাকাতের সঙ্গে অতিরিক্ত ১১ দিনের হিসাব যোগ করতে হবে। অনুরূপ কারও জাকাত সমাপনী হিসাব তারিখ রমজানে না হলে, তিনি অতিরিক্ত সময়ের জাকাত সমন্বয় করে জাকাত হিসাব তারিখ রমজানে নিয়ে আসতে পারেন।
ব্যবসায়িক নার্সারি, হর্টিকালচার, বীজ উৎপাদন খামার, কৃষি খামার, বনজ বৃক্ষ খামার, ফলদ বৃক্ষ খামার, ঔষধি গাছের খামার, চা-বাগান, রবার বাগান, তুলাবাগান, রেশমবাগান, আগর গাছের বাগান, অর্কিড নার্সারি ও ফুল বাগান, মুরগির খামার, মাছের খামার ইত্যাদি এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সামগ্রী-এসবের বর্তমান বাজারে বিক্রয়মূল্য হিসেবে ধরতে হবে।
সোনা, রূপা, নগদ টাকা ও ব্যবসায়ী পণ্য-এই তিন খাতে জাকাতবর্ষ পূর্তি বা জাকাত হিসাব সমাপনী দিনে যত সম্পদ থাকবে, তার পুরোটারই জাকাত দিতে হবে। জাকাতবর্ষের মধ্যে যেকোনো সময় অর্থাগম ঘটলে, বছর শেষে মোট সম্পদের সঙ্গে তারও যাকাত প্রদান করতে হবে। প্রতিবছরের একই তারিখে ও একই সময়ে জাকাতের হিসাব করতে হয়। যেমন: পয়লা রমজান সন্ধ্যা ৬টা। এই সময়ের এক সেকেন্ড আগে যে সম্পদ আসবে, তা এ বছরের জাকাতের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। এই সময়ের এক সেকেন্ড পর যে সম্পদ আসবে, তা পরবর্তী বছরের জাকাতের হিসাবে যাবে।
জমি, বাড়ি ও গাড়ি যা বিক্রির জন্য রাখা হয়নি, তা জাকাত হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে না। জমি, গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও প্লট, যেগুলো বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে, সেগুলোর বর্তমান বিক্রয়মূল্য (বাজারদর) জাকাতের হিসাবে আসবে এবং এর মূল্য হিসাব করে প্রতিবছর জাকাত দিতে হবে।
যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বাদ যাবে, তাৎক্ষণিক পরিশোধযোগ্য ঋণ এবং কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য ঋণের চলমান কিস্তির পরিমাণ অর্থ বাদ রেখে অবশিষ্ট সম্পদের জাকাত দিতে হবে।
চলতি মাসের (মার্চ-২০২৪) শুরুতে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) রেট অনুযায়ী ৫২ দশমিক ৫ তোলা ২২ ক্যারেট রুপার বারের দাম হলো- প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। (এখানে অলঙ্কার হিসেবে দাম ধরা হয়নি। কারণ, এক্ষেত্রে অলঙ্কার তৈরির মুজুরি অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু জাকাত ফরজ হয় স্রেফ রুপার ওপর। এজন্য রুপার বিস্কুটের দাম ধরা হয়েছে)।
সুতরাং এই পরিমাণ সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হলে তার ৪০ ভাগের এক ভাগ (২ দশমিক ৫০ শতাংশ) জাকাত দিতে হবে। শতকরা আড়াই টাকা বা হাজারে ২৫ টাকা হারে নগদ অর্থ কিংবা ওই পরিমাণ টাকার কাপড়চোপড় বা অন্য কোনও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দিলেও জাকাত আদায় হবে।