নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬ বিকাল ০৩:২১:১১
শর্ট ভিডিওর যুগে সাংবাদিকতায় তথ্য যাচাইয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ
মিডিয়া ও যোগাযোগ মাধ্যমের দ্রুত বিবর্তনের এই যুগে শর্ট ভিডিও তথ্যের অন্যতম প্রধান বাহন হয়ে উঠেছে। জটিল যেকোনো বিষয়কে এখন মোবাইল স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ডেই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে। আকর্ষণীয় ভিজ্যুয়াল, নিখুঁত সম্পাদনা ও সাবলীল উপস্থাপনা দর্শকের নজর কাড়লেও তা তথ্যের সত্যতার নিশ্চয়তা দেয় না। বরং চটকদার কনটেন্টের আড়ালে ভুল বা অর্ধসত্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এ বাস্তবতায় শর্ট ভিডিওর যুগে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সত্যতা যাচাইয়ের কলাকৌশল নিয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে (এনএসইউ) অনুষ্ঠিত হলো দুই দিনব্যাপী বিশেষ কর্মশালা।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহযোগিতায় এই ‘টিকটক মাস্টারক্লাস অন জার্নালিজম অ্যান্ড ডিজিটাল স্টোরিটেলিং’-এর আয়োজন করে জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটক।
কর্মশালায় শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা অংশ নেন। এতে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় যে, একটি ছোট ভিডিও তৈরি করতে সাধারণ প্রতিবেদনের চেয়েও বেশি পরিকল্পনা ও সতর্কতার প্রয়োজন। সীমিত সময়ের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে মূল কারণ তুলে ধরা যেমন জরুরি, তেমনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা প্রেক্ষাপট বাদ পড়া দর্শকের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। মোবাইল ভিডিওকে কেবল বিনোদনের উপকরণ হিসেবে না দেখে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা জোর দেন—একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন তৈরি করতে হলে শুরুতেই তথ্য যাচাই, নির্ভরযোগ্য উৎসের সন্ধান এবং সেই সূত্রটি দর্শকের কাছে উন্মুক্ত করা আবশ্যক।
আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘হোয়াট ডাজ দ্য ফিউচার জার্নালিস্ট লুক লাইক?’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাংবাদিকতার পরিবর্তনশীল রূপরেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে সত্য তথ্যের গুরুত্ব নিয়ে মতামত দেন বিশেষজ্ঞরা।
কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে যমুনা টেলিভিশনের গবেষক ও নর্দান ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মো. জাহিদ হোসেন খান নিউজরুমের বাস্তবিক অভিজ্ঞতার সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। সংবাদ নির্বাচন, এথিকস ও জনপরিসরে তথ্যের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, খবর প্রকাশের চেয়ে আগে তা যাচাই করা বেশি জরুরি।
এছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে দর্শক তৈরি ও ব্র্যান্ড সহযোগিতার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাশিক মোহতাসিন (ম্যাজিক রাজিক) ও সাবা চৌধুরী। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূলধারার সাংবাদিক ও স্বাধীন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কাজের পরিধি দিনে দিনে কীভাবে এক বিন্দুতে এসে মিলছে।
মাস্টারক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি ডিজিটাল স্টোরিটেলিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। নিজেদের ক্যাম্পাস ও আশেপাশের সামাজিক নানা ইস্যু নিয়ে বাস্তবধর্মী শর্ট ভিডিও তৈরি করেন শিক্ষার্থীরা। বিজয়ী দলগুলো পরবর্তীতে একটি জাতীয় টেলিভিশনের নিউজরুম পরিদর্শনের সুযোগ পায়, যেখানে তারা একটি বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ তৈরির অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সরাসরি প্রত্যক্ষ করে।
আয়োজনের মূল দর্শন তুলে ধরে টিকটকের এশিয়া-প্যাসিফিক এবং মেটাপিএসএই অঞ্চলের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি ও টেক কমিউনিকেশনস লিড ইমাদ জাফর বলেন, তরুণ সাংবাদিকদের শর্ট ভিডিওর ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। জবাবদিহিতা ও তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা গেলে শর্ট ফরম্যাটও সাংবাদিকতার আস্থার জায়গা হতে পারে।
মূলত একটি ভিডিওর দৈর্ঘ্য কয়েক সেকেন্ড বা এক মিনিট হতে পারে, কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখার পেশাদার দায়িত্ব কোনোভাবেই ছোট নয়।