শামীম আহমেদ জয়, মতলব প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ রাত ০৯:২৮:৪৫
মতলব উত্তরে অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য, বাড়ছে পরিবেশ ঝুঁকি
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় সরকারি বিধিবিধান উপেক্ষা করে অবাধে চলছে অবৈধ ইটভাটা। মৌসুম শুরুর পর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমির মাটি কেটে ইট তৈরি, শুকানো ও পোড়ানোর কাজে বেড়েছে তৎপরতা, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
২০২২ সালে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের দাবিতে উচ্চ আদালতে দায়ের করা এক রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। রায়ে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটা পরিচালনা নিষিদ্ধ, কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে ভাটা স্থাপন না করা এবং শিশু শ্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হলেও মতলব উত্তরে তার বাস্তবায়ন চোখে পড়ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ ইটভাটারই পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়া, জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানো এবং ধুলো-বালুর কারণে বায়ুদূষণ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্যমতে, মতলব উত্তর উপজেলায় চালু থাকা ১২টি ইটভাটার মধ্যে ১০টিই অবৈধ। এসব ভাটার মধ্যে রয়েছে—মেসার্স হালিমা ব্রিক্স, মতিন মনোয়ারা ব্রিকস, ফাইভ স্টার ব্রিক্স, ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড, টরকী ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং, এসবিএম ব্রিক্স, নাবিলা ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং, ইসলাম ব্রিক্স, সরকার ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং এবং নাজির আহাম্মদ চৌধুরী ব্রিকস।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে দিন-রাত ইট প্রস্তুত ও পোড়ানোর কাজ চলছে। অধিকাংশ ভাটাই গড়ে উঠেছে কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে, যা আদালতের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের শুরুতেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিবেশ দূষণ, কৃষিজমির ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যেত। তবে মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান চালানো হলেও কিছুদিন পর আবার আগের মতো কার্যক্রম শুরু হয়।
স্থানীয় কৃষক আবদুল জব্বার বলেন, কৃষিজমিতে বা তার পাশে ইটভাটা স্থাপনের কারণে ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেওয়ায় ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রভাবশালী মালিকদের কারণে প্রতিবাদ করতেও ভয় পান তারা।
কবির আহমেদ নামে এক বাসিন্দা জানান, ইটভাটা থেকে নির্গত সালফার অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের কারণে বায়ুদূষণ বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তিনি চলতি মৌসুমের শুরুতেই কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবি জানান।
এদিকে, ইট পরিবহনের সময় ট্রাক ও ট্রলিতে কাভার না থাকায় সড়কে বালু ছড়িয়ে পড়ছে এবং এলজিইডির গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাতে অনেক ভাটায় কাঠ পোড়ানোর ফলে কালো ধোঁয়া আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভাটা মালিক দাবি করেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। তবে নতুন নীতিমালার কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পাওয়ায় লাইসেন্স নবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে মতলব উত্তরে মাত্র ২টি ভাটা বৈধ, বাকিগুলো অবৈধ। ইতোমধ্যে দুইটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে।
জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যেগুলো নবায়নযোগ্য নয়, সেগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে।