মনজু বিজয় চৌধুরী, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৫ এপ্রিল ২০২৬ রাত ০৯:৩৭:১৫
ফেসবুকের ফেইক আইডি ও গুজবে অতিষ্ঠ মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজার জেলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ফেইক আইডি ও বিভিন্ন অনলাইন টিভি পেজের ভিত্তিহীন সংবাদের দৌরাত্ম্য উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভুয়া পরিচয়ে সম্মানহানিকর পোস্ট, বিকৃত মন্তব্য ও কৃত্রিম স্ক্রিনশট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পেজ খুলে যাচাই-বাছাই ছাড়াই সংবাদ প্রচার করছেন, যার অধিকাংশেরই কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। এসব খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমাজে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, প্রবাসী ও শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন। বিশেষ করে নারীদের ছবি ও নাম ব্যবহার করে কুৎসা রটানোর ঘটনা বাড়ছে, যা সামাজিকভাবে মারাত্মক হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনি জটিলতা ও সামাজিক লজ্জার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
সচেতন মহলের মতে, একটি টেলিভিশন চ্যানেল পরিচালনা বা পত্রিকা প্রকাশে বিপুল অর্থ ও কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্মার্টফোন দিয়েই যে কেউ সহজে ‘সংবাদ’ প্রচার করতে পারছে। ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় অনেকেই দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে তথ্য ছড়াচ্ছেন। একাধিক সিম ব্যবহার করে একই ব্যক্তি ভিন্ন নামে একাধিক আইডি খুলে অপপ্রচার চালানোর ঘটনাও ঘটছে।
স্থানীয়রা জানান, ভুয়া আইডি থেকে প্রথমে ইনবক্স বা ফোনে ভয় দেখানো হয়, পরে ‘মামলা থেকে বাঁচাতে’ অর্থ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে অপপ্রচার আরও বাড়ানো হয়, ফলে ভুক্তভোগীরা মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমার পরিবারকে নিয়ে ফেসবুকে মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এতে আমরা সামাজিকভাবে বিব্রত ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই। এ ধরনের ভিত্তিহীন সংবাদ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।”
সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, যাচাইবিহীন সংবাদ প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলে গুজব অনেকাংশে কমে আসবে। তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রচারের জন্য নীতিমালা ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।
প্রবীণ সাংবাদিক ও ছড়াকার আব্দুল হামিদ মাহবুবু বলেন, “সংবাদ প্রকাশের আগেই ফেসবুকে তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আইনবিরোধী। এ বিষয়ে সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, ফেইক আইডি ও অনলাইন টিভির কারণে পেশাদার সাংবাদিকরা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছেন। তিনি সাইবার অপরাধ দমনে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ, সাইবার পুলিশিং জোরদার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।
সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. জাফর ইকবাল বলেন, এসব ফেইক আইডি সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছে এবং কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়াচ্ছে, যা সামাজিক অবক্ষয় ডেকে আনছে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, ভুয়া ফেসবুক আইডির মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর ঘটনায় কেউ জিডি করলে পুলিশ ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় সব আইডি শনাক্ত করা কঠিন হয়। তিনি জানান, ভুক্তভোগীরা সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করলে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশনকারী অনলাইন চ্যানেল ও পেজ বন্ধ করা গেলে গুজব ও অপপ্রচার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।