মোঃ মোখলেছুর রহমান, কোনাবাড়ী, গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৭ মে ২০২৬ দুপুর ০২:২৫:৫১
প্রেম করে মানসিক ভারসাম্যহীন সম্রাট
মজনু লাইলিকে ভালোবেসে সংসার ও সমাজ ত্যাগ করে বনের পশুপাখির সাথে বসবাস শুরু করেছিলেন। ফরহাদ তার প্রেমিকা শিরির জন্য অসম্ভব কাজ করতে গিয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। চণ্ডীদাস ও রজকিনী রামীর প্রেমকাহিনী বাংলার লোককথা ও বৈষ্ণব সাহিত্যের এক অমর কিংবদন্তি, যা মূলত জাতপাতের ঊর্ধ্বে আত্মিক ও নিষ্কাম প্রেমের নিদর্শন। চতুর্দশ শতকের ব্রাহ্মণ কবি চণ্ডীদাস সমাজ ও জাতপাতের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে ধোপা কন্যা রামীর প্রেমে পড়েন।
তেমনি এক বাস্তব প্রেমের কাহিনি ঘটেছে সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানার ছনটেকি গ্রামের আব্দুল মালেকের বড় ছেলে সম্রাটের জীবনে।
তিন বছর আগেও সম্রাটের চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন। সহপাঠীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে। ২০২১ সালে ফারুকনগর ইসমাইল বেপারী উচ্চ বিদ্যালয়
থেকে এস এস সি পাশ করেন তিনি। স্কুল জীবনের সেই রঙিন দিনগুলোতে ভালোবেসে ফেলেছিলেন ওই স্কুলের এক মেয়েকে। কিন্তু সেই প্রেমই কাল হয়ে দাঁড়াল তার জীবনে। পরিবারের দাবি, প্রিয় মানুষটির একটু দেখা পেতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতেন সম্রাট। বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি প্রেমিকার পরিবার। অভিযোগ উঠেছে, ওই মেয়ের স্বজনরা সম্রাটকে তিন দফায় নির্মমভাবে মারধর করে। সেই পৈশাচিক আঘাত সরাসরি লাগে সম্রাটের মাথায়। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে তার মেধার আলো, পাল্টে যেতে থাকে আচরণের ধরন। টগবগে সুঠাম দেহের অধিকারী সম্রাট এখন শেকলবন্দি এক ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ রোগী। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি সয়ে মানবেতর দিন কাটছে তার।
এলাকাবাসী বলছেন শুধু প্রেমের কারণে এমন করুন পরিণতি সত্যি দুঃখ জনক। স্থানীয় বাসিন্দা ছুপিয়া বলেন,সম্রাট সুস্থ সবল ছিলো। পড়া লেখাতেও ভালো ছিলো। কিন্তু এক ঝড় এসে তার জীবনকে নরকে পরিণত করেছে। সম্রাটের সাথে যারা এমন নির্দয় আচরণ করেছেন আমরা তার বিচার চাই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,তার পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে শুনতে পারি সম্রাট যে স্কুলে পড়াশোনা করতো ওই স্কুলের এক মেয়েকে সে পছন্দ করতো। এই অপরাধে নাকি তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করে। এর পর থেকেই সে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। যার কারণে তাকে পায়ে শিকলবন্দী করে রাখে পরিবার।
সম্রাটের মা মোছা: স্বপ্না বেগম বলেন, আমার ছেলে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পরতো। পড়াশোনাতেও ভালো ছিলো। ছোট বেলা থেকেই কথা কম বলতো। কারো সাথে বেশি মিশতো না। এস এস সি পরীক্ষার পরে সে যে স্কুলে পড়াশোনা করতো ওই
স্কুলের একটি মেয়েকে পছন্দ করতো। তাকে দেখার জন্য রাস্তার একপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। এরপর মেয়ের পরিবারের সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে তিন দফার মারধর করে। মারধরের পর থেকে সে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। তিন বছর ধরে তার চিকিৎসা করাচ্ছি এখনো সুস্থ হয় না। রুমের জিনিসপত্র ভেঙ্গে ফেলে, বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়। বাধ্য হয়ে তার পায়ে শিকল দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছি। তিনি বলেন, আমি আর কিছু চাই না। আমার সন্তান যেন সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে এটাই চাওয়া।
সম্রাটের বাবা আব্দুল মালেক বলেন, আমার ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমি একদম নিঃস্ব হয়ে গেছি। বর্তমানে তাকে চিকিৎসা করাবো এমন পরিস্থিতি আমার আর নেই। ডাক্তার বলেছে তাকে যদি সঠিক চিকিৎসা করানো যায় তাহলে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। দেশের মানুষের কাছে তার ছেলেকে সুস্থ করতে আর্থিক সহায়তা চান তিনি।
ছনটেকি গ্রামের এই জঙ্গল থেকে সম্রাটের মুক্তি মিলবে কি? অর্থাভাবে কি নিভে যাবে একটি সম্ভাবনাময় জীবন? সম্রাটের এই অন্ধকার কারাবাস থেকে মুক্তি পেতে এবং তাকে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তুলতে সমাজের বিত্তবান শ্রেণী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সুদৃষ্টি একান্ত প্রয়োজন। একটু সহমর্মিতা আর সঠিক চিকিৎসা হয়তো এই শেকল ভেঙে সম্রাটকে ফিরিয়ে দিতে পারে এক স্বাভাবিক পৃথিবী।