মনজু বিজয় চৌধুরী, মৌলভীবাজার থেকে
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২৬ সকাল ১১:১০:৩৩
ঈদের আনন্দ চারদিকে, বড়লেখার সালেহ আহমদের বাড়িতে নেমে এসেছে নীরবতার দীর্ঘ ছায়া
যেখানে চারদিকে ঈদের আনন্দ, মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার গাজিটেকা (বাঁশতলা) গ্রামের গ্রামের আহমদ আলী ওরফে সালেহ আহমদের বাড়িতে নেই কোনো হাসি, নেই কোনো উৎসবের আমেজ। এই পরিবারের জন্য ঈদ যেন এক বেদনাদায়ক স্মৃতি। প্রতিটি মুহূর্তে তারা অনুভব করছেন প্রিয় মানুষটির অনুপস্থিতি এবং অভাবের তীব্র যন্ত্রণা। বড়লেখার এই ছোট্ট বাড়িটি যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় জীবনের নির্মম বাস্তবতা।
সরিজমিনে গিয়ে দেখা যায়,অন্য বাড়িতে যখন সকাল থেকেই রান্নার ঘ্রাণ, শিশুদের কোলাহল আর আনন্দের উচ্ছ্বাস, তখন এই বাড়ির আঙিনায় নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। এই পরিবারের মতো এমন অনেক পরিবারই রয়েছে, যাদের কাছে ঈদ মানেই আনন্দ নয়, বরং কষ্ট আর অভাবের আরেকটি দিন। প্রিয়জন হারানোর বেদনা আর অর্থনৈতিক সংকট মিলিয়ে তাদের জীবন হয়ে উঠেছে সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
জানা যায়, একসময় এই বাড়িতেও ঈদ আসতো অন্যসব দিনের মতোই রঙিন হয়ে। সংসারের কর্তা সালেহ আহমদ ছিলেন এই পরিবারের হাসির উৎস। তিনি ঈদের আগে বাজার করে আনতেন নতুন কাপড়, ছোটদের জন্য খেলনা, আর স্ত্রী-সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যতটুকু পারতেন চেষ্টা করতেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩৫ বছর ধরে দুবাই ছিলেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সালেহ আহমদ। দেশে এ নামে পরিচিত হলেও প্রবাসে তাঁর নাম হচ্ছে আহমদ আলী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইফতারের পর রাতে পানি সরবরাহের কাজে বের হলে দুবাইয়ের আজমান শহরে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র তাঁর গাড়িতে আঘাত করে। এ ঘটনায় তিনি মারা যান। তিনি পানির ট্যাংকার চালনা করতেন। সালেহ আহমদের বাড়ি বড়লেখা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাজীটেকা গ্রামে। তিনি গাজীটেকা গ্রামের মৃত সবর আলীর ছেলে। তাঁর স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে দেশেই থাকেন। এদিকে সোমবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে সালেহ আহমদের নিজ গ্রাম গাজীটেকার শাহী ঈদগাহে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গ্রামের কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
সোমবার (৯ মার্চ) সকালে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আহমদ আলীর মরদেহ পৌঁছালে তা গ্রহণ করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। পরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি নিজেই মরদেহ মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌরসভার গাজিটেকা গ্রামে পৌঁছে দেন এবং পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করেন। নিহতের পরিবারে স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তাঁরা সবাই দেশে থাকেন। তিনি বড়লেখা পৌরসভার গাজিটেকা গ্রামের মৃত সবর আলীর ছেলে।
নিহতের পরিবারে সালেহ আহমদের আব্দুল হক, ছেলে জাকির হোসেন ও বোরহান উদ্দিন এবং মেয়ে সাজেদা হকের জানান, “আমাদের পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে আমরা হারিয়েছি। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তিনি ছিলেন আমাদের ভরসা, আমাদের শক্তি। হঠাৎ করে তাকে হারিয়ে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি।
ছেলে জাকির হোসেন ও বোরহান উদ্দিন এবং মেয়ে সাজেদা হকের জানান,“ঈদ আমাদের জন্য সবসময় আনন্দের ছিল, কিন্তু এবার ঈদ এসেছে শুধুই শোক আর কান্না নিয়ে। চারদিকে যখন মানুষ আনন্দে মেতে উঠবে, তখন আমাদের ঘর থাকবে নিস্তব্ধ। আমাদের বাবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতেন, তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। তার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। আমরা শুধু তার জন্য দোয়া করি এবং এই কষ্ট নিয়ে দিন কাটানোর চেষ্টা করছি।”
সালেহ আহমদের নিহতের স্ত্রী মিনু বেগম অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “ঈদ আসলে আগে কত প্রস্তুতি থাকতো। উনি না থাকলে বুঝতাম না সংসার চালানো কত কঠিন। “বাচ্চারা নতুন কাপড় চায়, কিন্তু আমি দিতে পারি না। তাদের চোখের দিকে তাকাতে পারি না এই ঈদ আমাদের জন্য শুধু কষ্টের।”
স্থানীয় এক প্রতিবেশী জানান, একসময় এই বাড়িতেও ঈদের দিন মানেই ছিল আনন্দ-উৎসব। পরিবারের কর্তা সালেহ আহমদ নিজ হাতে সন্তানদের জন্য নতুন কাপড় কিনে আনতেন, সবার সঙ্গে হাসিখুশিভাবে সময় কাটাতেন। কিন্তু এখন সেই মানুষটি আর নেই, আর তার সঙ্গে হারিয়ে গেছে পরিবারের সব আনন্দ।
তার মেঝো ছেলে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। প্রতিমাসে তার চিকিৎসায় খরচ হয় আঠারো হাজার টাকা। শোকে স্তব্দ পরিবারের সদস্যরা কথা বলতে পারছেন না। সংসার কিভাবে চলবে, কিভাবে চিকিৎসার খরচ যোগার হবে এ নিয়ে শঙ্কায় স্থানীয়রা।
স্থানীয় বড়রেখা পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শাহজাহান বলেন, “ঈদ মূলত আনন্দ ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে, কিন্তু এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনার কারণে পুরো এলাকার মানুষের আনন্দ যেন ম্লান হয়ে গেছে। যেখানে সবাই খুশি থাকার কথা, সেখানে এই পরিবারের শোক আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, আমাদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে, এই পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। এবং তার যে সন্তান অসুস্থ আছে তার, তার জন্য যেই চিকিৎসার ব্যবস্থা সেটা আমরা করব। পরবর্তীতে তার যেই সক্ষম সন্তান রয়েছে তার জন্য একটা, একটা পারমানেন্ট একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ইনশাআল্লাহ আমরা করব।