অজিত কুমার দাশ, ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৭ মার্চ ২০২৬ রাত ০৭:২১:০৪
কবি মাহমুদুল হাসান নিজামীর মৃত্যু বহুভাষার এক আলোকবর্তিকার বিদায়
বাংলা সাহিত্য, গবেষণা ও সাংবাদিকতার অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। কবি, গবেষক, ভাষাতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ, গীতিকার, সুরকার ও সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান নিজামী আর আমাদের মাঝে নেই। তার প্রস্থান শুধু একজন কবির মৃত্যু নয়, বরং বহুমাত্রিক প্রতিভা ও সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান।
বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের আকাশ থেকে যেন আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ঝরে পড়ল। রংপুরে একটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর।
বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) সকালে রংপুরে অবস্থানকালে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সহকর্মীরা দ্রুত তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে পৌঁছানোর আগেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ছোট ভাই কাউখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি আরিফুল হক মাহবুব।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক ও বেদনার ছায়া।
জন্ম ও শৈশব
১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার কালাপানিয়া গ্রামের এক শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মাহমুদুল হাসান নিজামী। তার পিতা মরহুম মাওলানা আবদুল্লাহ ছিলেন সুপরিচিত আলেম, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। তিনি এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। মা মরহুমা মায়মুনা খাতুন ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও স্নেহময়ী গৃহিণী।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা নিজামীর মধ্যে ছোটবেলা থেকেই জ্ঞানচর্চা, সাহিত্যপ্রীতি ও ভাষা শেখার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। স্কুলজীবন থেকেই তিনি কবিতা লিখতেন এবং নতুন ভাষা শেখার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ দেখাতেন।
জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেছেন। যদিও জন্ম চট্টগ্রামে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার সদর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। সেখানেই গড়ে ওঠে তার সাহিত্যিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র।
বহুভাষাবিদ এক অনন্য ব্যক্তিত্ব
বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে মাহমুদুল হাসান নিজামীকে অনন্য করে তুলেছিল তার বিস্ময়কর বহুভাষাজ্ঞান। আরবি, ফার্সি, উর্দু ও ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় তার ছিল গভীর দখল।
বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী কবিদের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি শেখ সাদী, ফরিদ উদ্দিন আত্তার এবং প্রাচীন আরব কবি ইমরুল কায়েসের কবিতার বাংলা কাব্যানুবাদ করেন। তার অনুবাদের মাধ্যমে বিদেশি ধ্রুপদী কবিতার দর্শন ও মানবিকতা বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের সামনে নতুনভাবে উন্মোচিত হয়।
অনেক সাহিত্য সমালোচকের মতে, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পর এত বিস্তৃত ভাষাজ্ঞান ও অনুবাদসাধনায় নিজামীর মতো মানুষ সত্যিই বিরল।
সমৃদ্ধ সাহিত্যজীবন
মাহমুদুল হাসান নিজামীর সাহিত্যজীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক। কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুবাদ মিলিয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৪০টি। এছাড়া তিনি পাঁচ হাজারেরও বেশি কবিতা ও গান রচনা করেছেন।
তার লেখার বিষয়বস্তু ছিল বিস্তৃত—প্রেম, প্রকৃতি, ইতিহাস, দর্শন, মানবতা, সমাজের অসঙ্গতি, প্রতিবাদ ও মানবিক চেতনা। শব্দের নান্দনিক ব্যবহার ও গভীর ভাবনায় তিনি পাঠকের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা তুলে ধরতেন।
সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
কেবল লেখক হিসেবেই নয়, একজন সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি জাতীয় কবিতা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এবং এই সংগঠনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কবিতা চর্চা বিস্তারে ভূমিকা রাখেন। এছাড়া তিনি জাতীয় সাংবাদিক মঞ্চের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছিলেন।
সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দৈনিক ডেসটিনি এবং দৈনিক দেশজগত পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত লেখাগুলোতে সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধের নানা দিক উঠে এসেছে।
শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদান
নিজ এলাকার উন্নয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কাউখালী এলাকায় স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠায় তার অবদান রয়েছে। স্থানীয় মানুষ তাকে শুধু কবি বা সাংবাদিক হিসেবেই নয়, বরং একজন সমাজসেবক ও মানবিক মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন।
জানাজা ও দাফন
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কবি মাহমুদুল হাসান নিজামীর প্রথম জানাজা ঢাকায় বাংলা একাডেমি অথবা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলায় এবং তৃতীয় জানাজা হবে চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায়। সবশেষে কাউখালী কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তার পিতা-মাতার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
শোকের ছায়া
তার মৃত্যুতে দেশের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে গভীর শোক নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই আবেগঘন বার্তায় তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
এক আলোকবর্তিকার বিদায়
সাহিত্য এমন এক সাধনা, যা কেবল প্রতিভা দিয়ে নয়—ধৈর্য, অধ্যবসায় ও গভীর জীবনবোধ দিয়ে অর্জন করতে হয়। মাহমুদুল হাসান নিজামী সেই বিরল সাহিত্যিকদের একজন, যিনি তার প্রায় পুরো জীবনটাই সাহিত্যচর্চার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।
আজ তিনি নেই—
কিন্তু তার কবিতা, অনুবাদ, গবেষণা ও চিন্তার আলোয় বাংলা সাহিত্যের আকাশে দীর্ঘদিন জ্বলতে থাকবে তার স্মৃতি। তার সৃষ্টিকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা।