নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৪ মার্চ ২০২৬ বিকাল ০৩:০৪:৪৭
ইরানে আক্রমণ: যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় আক্রান্ত ইরান। জবাবে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে দেশটি। আর এ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম হারিয়েছে।
তুরস্কের রাষ্ট্র পরিচালিত বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির
সংগৃহীত তথ্য ও অনুমান অনুযায়ী এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৯০২ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে
বড় ক্ষতিটি হয়েছে কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে। সেখানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের এএন/এফপিএস–১৩২ আর্লি ওয়ার্নিং রাডার
সিস্টেম—যার মূল্য ১ দশমিক ১ বিলিয়ন
ডলার—শনিবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র
হামলায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কাতার নিশ্চিত করেছে, রাডারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত রোববার কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘ফ্রেন্ডলি
ফায়ার’ বা ভুলবশত গুলি ছোড়ার ঘটনায়
তিনটি এফ–১৫ স্ট্রাইকিং ঈগল যুদ্ধবিমান
ধ্বংস হয়। তিন যুদ্ধবিমানে থাকা ছয় পাইলট প্রাণে বেঁচে গেলেও বিমানগুলো আর ফেরেনি।
এগুলো প্রতিস্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৮২ মিলিয়ন ডলার।
শনিবার ইরানের প্রাথমিক প্রতিশোধমূলক হামলায় বাহরাইনের
মানামায় অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরেও আঘাত হানা হয়। এতে দুটি
স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল ও কয়েকটি বড় ভবন ধ্বংস হয়। ওপেন সোর্স গোয়েন্দা প্রতিবেদনের
ভিত্তিতে লক্ষ্যবস্তু করা স্যাটকম (SATCOM) টার্মিনালগুলোকে এএন/জিএসসি–৫২বি হিসেবে শনাক্ত করা
হয়েছে। স্থাপন ও মোতায়েন ব্যয়সহ প্রতিটির মূল্য আনুমানিক ২০ মিলিয়ন ডলার।
ইরান আরও দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-রুয়াইস
শিল্পনগরীতে মোতায়েন করা থাড (THAAD) অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবস্থার এএন/টিপিওয়াই–২ রাডার উপাদান তারা ধ্বংস
করেছে। ওপেন সোর্স স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে আঘাতের প্রমাণ মিলেছে। ধ্বংস হওয়া রাডারটির
মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
এই সব ক্ষয়ক্ষতি যোগ করলে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের
সামরিক সম্পদের প্রায় ১ দশমিক ৯০২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ক্ষতি করেছে ইরান।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু
করার পর থেকে ইরান এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত সাতটি মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে
লক্ষ্যবস্তু করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর,
কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান, আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প বুয়েরিং, ইরাকের এরবিল
ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দর—যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে
বড় নৌপোত—এবং কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি।
কুয়েতে আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির ভেতরে একাধিক স্থানে
ছাদের অংশ ধসে পড়ার ছবি প্রকাশ পেয়েছে। আগের দিন ইরানের হামলার খবরের পর এসব চিত্র
সামনে আসে। ক্যাম্প আরিফজান ছিল সেই প্রধান স্থান, যেখানে ছয়জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত
হন। কুয়েতের ক্যাম্প বুয়েরিংয়ের ভেতর থেকে ধারণ করা বহুল প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা
গেছে, একটি ড্রোন স্থাপনার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে ভেতরে বিস্ফোরিত হচ্ছে।
ইরানি হামলায় ধ্বংস কাতারসহ অন্তত ৭ মার্কিন স্থাপনার
রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থাইরানি হামলায় ধ্বংস কাতারসহ অন্তত ৭ মার্কিন স্থাপনার রাডার
ও যোগাযোগব্যবস্থা
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের যাচাইকৃত ফুটেজ
ও ছবিতে দেখা গেছে, ইরান শনিবার ও রোববার জুড়ে ইরাকের এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের
সামরিক স্থাপনাকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করেছে। সেখানে মার্কিন বাহিনী অবস্থান করছে। এলাকা
থেকে ধোঁয়া ও আগুনের শিখা উঠতে দেখা যায়। রোববার সকাল নাগাদ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা
যায়, ঘাঁটির একাংশে চারটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। সোমবার ভোর পর্যন্তও
সেখানে আগুন জ্বলছিল।
এদিকে, রোববার দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের স্যাটেলাইট
চিত্রে একটি বেষ্টনীঘেরা মার্কিন নৌবাহিনীর বিনোদন জোনের ভেতরে বড় একটি ভবন থেকে ধোঁয়া
উঠতে দেখা যায়। এটি আনুষ্ঠানিক মার্কিন ঘাঁটি না হলেও জেবেল আলি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন
নৌবাহিনীর সবচেয়ে ব্যবহৃত নোঙরস্থলগুলোর একটি।
সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব
আমিরাতে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনও হামলার লক্ষ্য হয়েছে। সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন
দূতাবাসে দুটি ড্রোন আঘাত হানে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কম্পাউন্ডে সীমিত
অগ্নিকাণ্ড ও সামান্য ভৌত ক্ষতি হয়েছে। দূতাবাস প্রাঙ্গণের ভেতরে থাকা সিআইএ স্টেশনও
আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
কুয়েত সিটিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র
হামলার শিকার হয়। দূতাবাসের আশপাশে ধোঁয়া দেখা গেছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রকাশ্যে
খুব সীমিত। দূতাবাস ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
অপ্রয়োজনীয় কর্মী ও তাঁদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট
জেনারেল ভবনের পাশের পার্কিং লটে সন্দেহভাজন ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এতে আগুন লাগে,
তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনে। কনস্যুলেট প্রাঙ্গণে আঘাতের চিহ্ন
থাকলেও বড় ধরনের কাঠামোগত ধ্বংস হয়নি।