নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ রাত ০৭:০৯:৫৮
‘মাদরাসায়’ যৌন নিপীড়ন বন্ধে শায়খ আহমাদুল্লাহ’র বার্তা
রাজধানীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডসহ দেশজুড়ে যখন শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদরাসায় যৌন নিপীড়ন বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছেন আলোচিত ইসলামিক বক্তা শায়খ আহমাদুল্লাহ।
২৩ মে শনিবার সন্ধ্যায় নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি এ বিষয়ে একটি পোস্ট দেন।
পোস্টে তিনি লিখেন, আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানাবিধ অনাচারের ঘটনা অস্বীকারের উপায় নেই। মাদরাসায় যৌন নিপীড়নের মতো ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এ বিষয়ে ২০১৯ সালে একটি লিখিত সুপারিশমালা দিয়েছিলাম। বর্তমানে হজের সফরে আছি বিধায় এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ নেই। দেশে ফিরে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত প্রস্তাবনা পেশ এবং কাজ করার পরিকল্পনা আমার রয়েছে ইনশাআল্লাহ।
এদিকে তার পোস্টের কমেন্ট সেকশনে তিনি মাদরাসায় যৌন নিপীড়নের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যেসব বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি সে বিষয়ে ২০১৯ সালে তার দেওয়া একটি লিখিত সুপারিশমালা তুলে ধরেন।
নিচে আহমাদুল্লাহর দেওয়া লিখিত সুপারিশমালাটি হুবহু তুলে ধরা হলোঃ
রামিসার নৃশংস ঘটনা নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, আমি তখন হজের সফরের উদ্দেশে ঢাকা এয়ারপোর্টে। এয়ারপোর্টে থাকা অবস্থায়ই এ নিয়ে সংক্ষিপ্ত পোস্ট করি।
এর কিছুক্ষণ পর যখন বনশ্রী মাদরাসার আরেক ট্রাজেডির নিউজ ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমি মাঝ আকাশে নেটওয়ার্কের বাইরে। সৌদি আরব পৌঁছার পর ঘটনা জানতে পারলেও উমরাহ পালনসহ সফরের নানাবিধ ব্যস্ততায় এদিকে আর সেভাবে মনোনিবেশ করতে পারিনি।
তবে আমি অনেক আগে থেকেই বলে আসছি, ধর্ষক মাদরাসার হোক কিংবা মাদরাসার বাইরে—তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে শাস্তি কার্যকর করতে হবে।
আবাসিক মাদরাসায় যৌন-অনাচার কমবেশি আছে, এটা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। আমরা যদি এ বিষয়ে নীরব থাকি বা উপেক্ষা করি, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং সমস্যা আরো বাড়বে। আর এ কারণেই নানা সময়ে এই অনাচার বন্ধে আমি লেখালেখি করেছি।
মাদরাসার প্রতিটি কক্ষ সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, যথাযথ শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের ফ্যামিলি বাসার ব্যবস্থা ও নিয়মতান্ত্রিক ছুটি, শ্রেণীকক্ষ ও আবাসন একসঙ্গে না রাখা, শিক্ষার্থীদের ঢালাও বিছানার পদ্ধতি বন্ধ করে পৃথক খাটের ব্যবস্থা, মহিলা মাদরাসায় পুরুষ শিক্ষক ও স্টাফ নিয়োগ না দেয়াসহ বেশ কয়েকটি পরামর্শ আমি ২০১৯ সালের এক পোস্টে তুলে ধরেছিলাম।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বলাৎকারের ঘটনা যে ঘটে, সেটা যেমন সত্য, অনেক ক্ষেত্রে মিডিয়া সত্যের সাথে মিথ্যার রং মাখায় সেটাও সত্য। আবার কিছু কিছু জায়গায় অন্যকে রক্ষা করতে দুর্বল ইমাম বা আলেমকে ফাঁসানো হয়।
যেমন সম্প্রতি ফেনীতে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়েছেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক। ফরেনসিক পরীক্ষায় ওই কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে ইমামের নয়, বরং কিশোরীর বড় ভাইয়ের ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে।
আবার প্রমিনেন্ট এবং বড় বড় মাদরাসায় এই ধরনের অভিযোগ তেমন শোনা যায় না। বরং মূল স্রোতের বাইরে কিন্ডার গার্টেনগুলোর মতো অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা ছোট ছোট মাদরাসাতেই এই ধরনের ঘটনার কথা বেশি শোনা যায়।
তবে ঘটনা ছোট মাদরাসায় ঘটুক কিংবা বড় মাদরাসায়, এইসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের প্রস্তাবনা বলা, হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আলেম ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এক্সপার্টদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করা হোক।
যেখানেই এই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাবে, এই কমিশন সেখানে ছুটে যাবে এবং সরেজমিন তদন্ত করবে। তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে অপরাধীকে বিচারের মুখামুখি করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর কোনো মাদরাসায় যেন চাকরি নিতে না পারে তার জন্য ব্ল্যাকলিস্টে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। আর যদি ঘটনা ভিন্ন হয়, সেটাও সংবাদ সম্মেলন করে জাতির সামনে উত্থাপন করবে।
এতে একদিকে যেমন এ ধরনের অপরাধের ঘটনা কমে আসবে, সেই সাথে এগুলো কোনটা বাস্তব আর কোনটা ষড়যন্ত্র সেটাও জাতির সামনে পরিষ্কার হবে। হজের সফর শেষে সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত পরিকল্পনা পেশ করার ইচ্ছা আছে ইনশাআল্লাহ।
বর্তমানে দেশজুড়ে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তির যে সংকট তৈরি হয়েছে, এই সংকট দূর করতে এবং মাদরাসার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ও সুধারণা অটুট রাখতে এই ধরনের উদ্যোগ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। দ্বীনের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এদেশের মাদারাসা-ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে আসুন সবাই একসাথে কাজ করি। এরপরও যদি আমরা উদাসীন থাকি, তবে তা সর্বনাশের কারণ হতে পারে।