এপিএমসিই ২০২৬ সমাপনীতে প্রকৌশলীদের আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬ রাত ১১:২৭:৪৫
টেকসই নগর গড়তে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, নদী-খাল রক্ষা ও গবেষণার সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ
টানা ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি এবং দ্রুত নগরায়ণের চাপে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও নগর ব্যবস্থাপনা নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে প্রকৌশলীদের আরও কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দেশের বিশিষ্ট প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদেরা।
রোববার (১২ জুলাই) রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে আইইবির পুরকৌশল বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত Annual Paper Meet of Civil Engineering (APMCE 2026)-এর সমাপনী অনুষ্ঠান এবং "Engineering a Sustainable Future: The Role of Civil Engineers in Achieving the UN Sustainable Development Goals" শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী প্রকৌশলীরা অংশ নেন। দুই দিনব্যাপী এপিএমসিই-তে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবহন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
নদী-খাল বাঁচিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনার আহ্বান
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় কেবল তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন পরিকল্পনা।
তিনি বলেন, নদী, খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক বন্যাপ্রবাহের পথ অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হলে জলাবদ্ধতা, বন্যা ও পরিবেশগত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি কৃষি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমান বাস্তবতায় সেই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড. ইকবাল বলেন, উজান থেকে নেমে আসা বিপুল পলি দেশের নদীগুলোর নাব্যতা কমিয়ে দিচ্ছে। তাই নিয়মিত ড্রেজিং, আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক পলি ব্যবস্থাপনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতা ও বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
গবেষণা যেন নীতিনির্ধারণে কাজে লাগে
ডুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. আবু তায়েব বলেন, এপিএমসিই কেবল একটি গবেষণা সম্মেলন নয়; এটি জ্ঞান বিনিময় ও উদ্ভাবনী ধারণাকে জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
তিনি বলেন, বিভিন্ন গবেষণাপত্রে উপস্থাপিত সুপারিশগুলো শুধু একাডেমিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি সংস্থার কাছে পাঠিয়ে বাস্তব নীতিনির্ধারণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
ঢাকা-চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার কারণ ব্যাখ্যা
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে ঢাকা ও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাজধানীর যান চলাচল, শিক্ষা কার্যক্রম ও নগরজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রামেও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। অন্যদিকে ঢাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও তা নগরীর প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অপর্যাপ্ত।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, রাজধানীর অনেক ড্রেন ও খাল পাম্পিং স্টেশনের মাধ্যমে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানির স্তর কম থাকলে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হলেও বর্ষায় নদীর পানি বেড়ে গেলে সেই সক্ষমতা কমে যায়। পাশাপাশি খাল দখল, জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বর্জ্যে ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়াও জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
টেকসই উন্নয়নে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর ওপর জোর
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. এস এম আতিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের সুযোগ নষ্ট করা যাবে না—এটাই টেকসই উন্নয়নের মূল দর্শন।
তার মতে, উন্নয়ন হতে হবে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল এবং সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। এজন্য প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম ব্যবহার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি ও সম্পদের অপচয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের নগর উন্নয়নে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শক্তি-সাশ্রয়ী ভবন, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে গণপরিবহন, বৈদ্যুতিক যানবাহন, সাইকেল লেন, হাঁটার উপযোগী অবকাঠামো এবং কম-কার্বন প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে পারলে কার্বন নিঃসরণ কমবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।
গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে সেতুবন্ধনের আহ্বান
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইইবির পুরকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম (খোকা)। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিভাগের ভাইস-চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আয়নুল কবির এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী নেসার উদ্দিন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে আইইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী এ.টি.এম. তানবীর-উল হসান (তমাল), সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ ওসমানী, সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এইচআরডি) প্রকৌশলী মো. নূর আমিন, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য, বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের নেতা, চ্যাপ্টার প্রতিনিধিসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকৌশল গবেষণা ও বাস্তব নীতিনির্ধারণের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে আরও এগিয়ে যেতে পারবে।