নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬ বিকাল ০৪:১৩:৩৪
জলবায়ু পরিবর্তনে মানবাধিকার লঙ্ঘন ঠেকাতে রোডম্যাপ চায় নাগরিক সমাজ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও সম্মুখসারির জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানবাধিকার সুরক্ষায় একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিয়মিত নজরদারি এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ‘বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে সুরক্ষায় ইউপিআর-৪ সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা’ শীর্ষক জাতীয় অ্যাডভোকেসি সেমিনারে এ আহ্বান জানানো হয়।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার (এসিএফ) এবং ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশ যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে নীতিনির্ধারক, মানবাধিকারকর্মী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সেমিনারে বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা (ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ—ইউপিআর) পর্বে সরকার সমর্থিত জলবায়ু–সম্পর্কিত সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতি চিহ্নিত করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মানুষের অধিকার রক্ষায় নীতি ও কর্মপরিকল্পনার সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হয়।
ইউপিআরের ১২ সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী ও ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক মো. শামসুদ্দোহা বলেন, ২০১৮ সালে বাংলাদেশের তৃতীয় ইউপিআর চক্রে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা ও প্রশমনের বিষয়ে দুটি সুপারিশ সমর্থন করেছিল।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে চতুর্থ ইউপিআর চক্রে সিপিআরডির নেতৃত্বে ১৫টি নাগরিক সংগঠনের একটি জোট যৌথভাবে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরার পাশাপাশি সাতটি বিষয়ে কৌশলগত পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়।
পরে ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য সরকার ১২টি সুপারিশ গ্রহণ করে।
শামসুদ্দোহা বলেন, ‘এই অঙ্গীকারগুলো কতটা নীতি, কর্মসূচি ও বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নিয়েছে, তা অনুসরণ করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। পাশাপাশি কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে তা দূর করা যায়, সে পথও চিহ্নিত করতে হবে।’
জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার
সেমিনারের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নূরুন নাহার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান ভূমিকা রাখছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও সম্মুখসারির জনগোষ্ঠী এর সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন মোকাবিলার জন্য এখনো যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের।
সিপিআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার—রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি শেখ নূর আতায়া রাব্বি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে তৃতীয় ইউপিআর চক্রের পর থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে চতুর্থ ইউপিআর চক্রে নাগরিক সমাজের দেওয়া সুপারিশ এবং সেগুলোর বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
সেমিনারের বিশেষ অতিথি পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পিকেএসএফের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
তিনি নিয়মিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অ্যাডভোকেসি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, এমবিই, সিপিআরডি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর উদ্যোগের প্রশংসা করেন। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও সম্মুখসারির জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মানবাধিকারকর্মী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন শাহীন আনাম।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে সরকারের উদ্বেগ রয়েছে। তবে মানুষের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।
এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও নাগরিক সমাজের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন নীতিগত ও বাস্তবায়ন ঘাটতি নিয়ে বিশেষজ্ঞ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে নীতিনির্ধারক, মানবাধিকারকর্মী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং নীতিগত ও জনমত গঠনের জন্য নাগরিক সমাজের একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মকৌশলের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির কথাও জানানো হয়।