একা ও একাকীত্ব যেমন
আধুনিক জীবনের অফিস, যানজট, কোলাহলের মাঝেও কিছু মানুষ একা। এই একা থাকা কারও জন্য অসুখ আবার কারও জন্য সৃজনশীলতা বিকাশের মাধ্যম। বিশেষজ্ঞরা ভরছেন, একা থাকা ভালো। কিন্তু একাকীত্বে ভোগা ক্ষতিকর। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনা এ বিষয়ে বলেন, “একা থাকা আর একাকিত্ব দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একা থাকা স্বাধীনতা দিতে পারে, তবে একাকিত্ব হল সেই অনুভূতি যখন মানুষ সম্পর্কের অভাব অনুভব করে, যদিও তার চারপাশে হাজারও মানুষ থাকে। এটি মনের ভেতরের শূন্যতা, যা বাহ্যিক উপস্থিতি দিয়ে সবসময় পূরণ করা যায় না।”আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তি-নির্ভরতা, ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতা সব মিলিয়ে মানুষের জীবনে একাকিত্ব যেন নীরব মহামারি হয়ে উঠেছে। কেউ কর্মজীবনের চাপে, কেউ পারিবারিক বিচ্ছেদে, কেউবা প্রেম বা সম্পর্ক ভাঙার যন্ত্রণায় একা হয়ে পড়েন। আবার কেউ নিজের ইচ্ছায় একা থাকতে চান।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ একাকিত্বে ভোগেন। নিম্ন আয়ের দেশে এই হার আরও বেশি, প্রায় ২৪ শতাংশ। বয়স্কদের মধ্যে তিনজনে একজন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও একাকিত্ব দ্রুত বাড়ছে।একাকিত্ব শুধু মানসিক সমস্যা নয়, এটি শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি।‘ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো’র করা গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন একাকিত্বে থাকলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি দ্বিগুণ বেড়ে যায়।২০১৫ সালে করা ‘প্রোসেডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’য়ে প্রকাশিত এই গবেষণা পত্রে আরও উল্লেখ করা হয়- একাকিত্বে ভুগলে রক্তচাপ বাড়ে, শরীরে প্রদাহ বৃদ্ধি পায়, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে এবং ডিমেনশা বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাকিত্বের কারণে বছরে প্রায় আট লাখের বেশি মানুষ মারা যান। মানসিকভাবে এটি বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মসম্মান কমে যাওয়া এবং আত্মহত্যা-প্রবণ চিন্তার ঝুঁকি বাড়ায়।একাকিত্বে ভোগা মানুষদের মধ্যে দেখা যায় শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান বা মাদকাসক্তির প্রবণতা, সামাজিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলা এবং অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার।অনেকে বাস্তব সম্পর্কের বদলে ‘ভার্চুয়াল’ জগতে বেশি সময় কাটান, যা একাকিত্বকে আরও গভীর করে। খাদ্যাভ্যাসেও প্রভাব পড়ে। একা মানুষেরা প্রায়ই অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া করেন, ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খান, অনেক সময় না খেয়ে থাকেন বা অতিরিক্ত খান। ফলে পুষ্টিহীনতা বা স্থূলতা দেখা দেয়।তবে ডা. দিনা বলছেন, “একা থাকা আর একাকিত্ব এক নয়। অনেকে নিজের ইচ্ছায় একা থাকেন। এতে তারা নিজের পছন্দের কাজে সময় দেন, নতুন দক্ষতা শেখেন, সৃজনশীলতা বিকশিত করেন। এই ধরনের একাকী সময় আত্মোপলব্ধি ও স্বনির্ভরতা বাড়ায়।” তবে যখন একাকিত্বে ভোগা শুরু হয় তখন সেটা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “একাকিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে সম্পর্ক গড়ে তোলা, সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া জরুরি। পরিবার, বন্ধু ও সমাজের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা জরুরি।”নিয়মিত ব্যায়াম করা, প্রকৃতির কাছে যাওয়া। নতুন কিছু শেখা বা কোর্সে যোগ দেওয়া। পুরানো বন্ধু-আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো। স্বেচ্ছাসেবী কাজে সময় দেওয়া।প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া। ওপরের তথ্যগুলো জানিয়ে ডা. ফারজানা রহমান বলেন “একাকিত্ব নীরব কিন্তু গভীর সংকট। এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাও বটে। তাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উচিত এই নীরব মহামারির বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানো।” মানুষ শেষ পর্যন্ত একা নয়— সম্পর্কের মাঝেই তার সত্যিকারের অস্তিত্ব।