নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২ এপ্রিল ২০২৬ দুপুর ০২:০০:৪৯
টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ মিস ইতালির, যেনো থমকে গেছে যাত্রা
আঠারো, বাইশ আর ছাবিশ। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের বাইরে। র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা বসনিয়ার কাছে প্লে-অফে হেরে দোনারুম্মা-ব্যারেলাদের এই ব্যর্থতা এখন শুধু মাঠের ফল নয়, জাতীয় হতাশায় রূপ নিয়েছে।
বিশ্বকাপ মিস করার পরের সকালটা ইতালির বড় শহরগুলোতে যেন একই ছবিতে ধরা পড়েছে। রোম, মিলান, নেপলস—সব জায়গাতেই ক্যাফেতে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে স্তব্ধ দৃষ্টি, আর ভক্তদের মনে একটাই প্রশ্ন আবারও কেন?
দেশটির শীর্ষ দৈনিকগুলো এই ব্যর্থতাকে সরাসরি শিরোনাম করেছে ‘বিশ্বকাপের অভিশাপ’ নামে। ২০০৬ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে ইতালির বিশ্বকাপ যাত্রা যেন ক্রমাগত পতনের গল্প। ২০১৪ সালের পর আর একবারও মূল পর্বে জায়গা করতে পারেনি তারা।
মঙ্গলবার রাতের ম্যাচটি যেন পুরো গল্পটাই একসঙ্গে বলে দেয়। এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ হাতছাড়া, তারপর পেনাল্টি শুটআউটে ভেঙে পড়া। মাঠের হতাশা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারি থেকে শুরু করে শহরের অলিগলিতে।
টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপ মিসের পর ইতালিতে ফুটবল পুনর্গঠনের ডাক
রোমের এক পাবে খেলা দেখা সমর্থক দাভিদে কালদারেত্তার প্রতিক্রিয়া ছিল সরল কিন্তু তীব্র, ‘শুরু থেকেই সব ভুল হচ্ছিল। দল ঠিক ছিল না, সিদ্ধান্তগুলোও বোঝা যাচ্ছিল না। সত্যি বলতে আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।’ এই অনুভূতিটাই এখন পুরো ইতালির।
অধিনায়ক জিয়ানলুইজি দোনারুম্মা ম্যাচের পর নিজের হতাশা লুকাতে পারেননি। সামাজিকমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, এই হার তাকে কাঁদিয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতীর্থদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এখান থেকেই নতুন করে শুরু করতে হবে।
কিন্তু আলোচনা শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ নেই। টানা তিন বিশ্বকাপ মিস করার পর ইতালিজুড়ে এখন শুরু হয়েছে দায় নির্ধারণের আলোচনা।
রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি বড় আকার নিয়েছে। ক্ষমতাসীন জোটের নেতারা ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি গ্যাব্রিয়েলে গ্রাভিনার পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাদের ভাষায়, এই ব্যর্থতা ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং এখান থেকে বের হতে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।
ক্রীড়া ও যুবমন্ত্রী আন্দ্রেয়া আবোদি বলেছেন, এটি কেবল একটি ম্যাচের হার নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল। তার মতে, ইতালিয়ান ফুটবলকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে—গোড়া থেকে।
টানা তিন বিশ্বকাপ মিস করার পর এমন সরাসরি সরকারি প্রতিক্রিয়া ইতালির ফুটবলে খুব একটা দেখা যায় না। ফলে পরিবর্তনের চাপ এখন আরও স্পষ্ট।
সমস্যা যে শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নয়, সেটিও উঠে আসছে আলোচনায়। তরুণ প্রতিভা তৈরি, লিগের প্রতিযোগিতা, কোচিং কাঠামো সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
সমর্থকদের হতাশাও ক্রমেই গভীর হচ্ছে। এক সমর্থক মেলানি কার্দিয়ো বলেন, ‘প্রতিবারই ভাবি এবার হয়তো হবে। কিন্তু একই ঘটনা বারবার ঘটছে। এবারটা খুব কঠিন।’
বিশ্ব ফুটবলে ইতালির ইতিহাস, ঐতিহ্য বা প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মুহূর্তে তারা সেই জায়গায় নেই যেখানে থাকার কথা।
একসময় যে দল বিশ্বকাপ জয়ের গল্প লিখত, তারা এখন সেই গল্পের বাইরে দাঁড়িয়ে। সামনে তাদের জন্য একটাই বড় প্রশ্ন—এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইতালি কি সত্যিই বদলাতে পারবে?
ইতালির সামনে এখন দুটি পথ এক, ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে একইভাবে চলা; দুই, কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে শুরু করা।
দেশজুড়ে যে ক্ষোভ, যে প্রশ্ন তা দেখলে মনে হয়, এবার হয়তো দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিতে বাধ্য হবে ইতালি।