ঋণে জর্জরিত জেলেরা: নদীতে মাছ না মিললে ‘বিষ খেয়ে মরতে হবে’—হতাশার আর্তনাদ
সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে টানা দুই মাস নদীতে মাছ ধরতে না পেরে চরম সংকটে পড়েছেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার জেলেরা। ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত জীবিকার চাপে তাদের অনেকেই হতাশায় ভুগছেন।“সরকারের কথা মাইন্যা দুই মাস নদীতে নামি নাই। কিন্তু সংসার তো থেমে থাকে না। সুদে টাকা নিছি, এখন সেই ঋণের বোঝা বইতেছি। সময়মতো টাকা শোধ করতে না পারলে বিষ খাইয়া মইরা যাইতে হইবো”—কথাগুলো বলেন মোহনপুর গ্রামের জেলে আবুল হোসেন। তার কণ্ঠে স্পষ্ট হতাশা আর দুশ্চিন্তার ছাপ।ইলিশ সম্পদ রক্ষায় মার্চ-এপ্রিল দুই মাস পদ্মা-মেঘনা নদীর প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকাসহ ছয়টি নদী অঞ্চলে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। এই সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন, বিক্রি ও মজুদ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয় সরকার। ফলে অধিকাংশ জেলে পরিবার ধারদেনা করে কোনোমতে সংসার চালিয়েছে।একই গ্রামের জেলে কাইল্লা বেপারী জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। পরিবার চালাতে সুদে টাকা ধার নিতে হয়েছে। এখন নদীতে নামার প্রস্তুতি থাকলেও পর্যাপ্ত মাছ না পেলে ঋণ শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।ষাটনল জেলে পাড়ার টিটু বর্মন বলেন, “সরকার চাল দিলেও সংসারের সব খরচ তো শুধু চাল দিয়ে চলে না। ঔষধ, পড়াশোনা, নৌকা-জাল মেরামত—সব মিলিয়ে আমরা খুব কষ্টে আছি। এখন মাছ না পাইলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হইবো।”আরেক জেলে মো. আনোয়ার বলেন, নদীতে মাছের সংখ্যা দিন দিন কমছে। নদীর দূষণ, স্রোত কমে যাওয়া, ডুবচর জেগে ওঠা এবং অবৈধ জাটকা নিধনের কারণেও উৎপাদন কমে যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।এদিকে অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছর জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে নদীতে জোরালো অভিযান কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। ফলে অনেকেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাটকাসহ বিভিন্ন মাছ ধরেছে, যা ভবিষ্যৎ ইলিশ উৎপাদনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।সচেতন মহল ও গবেষকদের মতে, জাটকা নিধন অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতি ও জেলেদের জীবন-জীবিকায়।মতলব উত্তর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং জেলেদের ভিজিএফের চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি জেলেদের সচেতন হয়ে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার আহ্বান জানান।বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমান বলেন, “আজকের জাটকা আগামী দিনের বড় ইলিশ। যদি নির্বিচারে জাটকা ধরা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।” তিনি জানান, ৭০-৮০ শতাংশ জাটকা সংরক্ষণ করা গেলে দেশে ইলিশ উৎপাদন আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।চাঁদপুর অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, জাটকা রক্ষা অভিযানে ৫ শতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে এবং প্রচুর জাল ও নৌকা জব্দ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সামগ্রিকভাবে অভিযান সফল হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে মাঝে মাঝে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে।জেলেদের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে টেকসই সমাধান ও বাস্তবসম্মত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।