নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬ দুপুর ০১:৪৭:৫৬
অবৈধ আয়ের পাহাড়ে চড়েছেন গণপূর্তের তৈমুর আলম
ঢাকার গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল–মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল–৪–এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. তৈমুর আলমকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একাধিক সূত্র, অভিযোগপত্র এবং সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, কমিশন বাণিজ্য এবং একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মতো অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
দরপত্র ও প্রকল্প বণ্টনে প্রভাবের অভিযোগ
সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘ সময় একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সুযোগে তিনি একটি প্রভাব বলয় গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে বড় প্রকল্পের কাজ পেত।
অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্ত প্রভাবিত করা এবং নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা ছিল। একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বারবার বড় অঙ্কের প্রকল্প পাওয়ায় দপ্তরের ভেতরেও অসন্তোষ তৈরি হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কাজ অনুমোদন এবং বিল দ্রুত অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনিয়মের বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।
পারিবারিক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগের আরেকটি অংশে তার পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততার কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে তার ছোট ভাই অংকুরের নাম উল্লেখ করে কিছু সূত্র দাবি করছে, প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে ঠিকাদারি কার্যক্রমে সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের চূড়ান্ত রায় পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থানও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রশাসনিক অবস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব
সূত্রগুলো আরও বলছে, তিনি ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে দীর্ঘ সময় দায়িত্বে ছিলেন। বদলি নীতির প্রচলন থাকা সত্ত্বেও একই এলাকায় ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এর ফলে প্রকল্প বণ্টন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়তে পারে—এমন আলোচনা দপ্তরের ভেতরে রয়েছে বলে জানা যায়।
মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ার দাবি
একটি অংশের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার একটি আদালতে দায়ের হওয়া একটি মামলায় (সিআর মামলা নং–১১৮/২০২৫) গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ওই নথিতে সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বরাদ্দে অনিয়ম এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
তবে আদালতের নথি, অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা এবং তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য এখনো পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি।
সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
অভিযোগপত্র ও সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ই/এম সার্কেল–৪–এর অধীনে একটি সমন্বিত প্রভাব বলয় গড়ে উঠেছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে অবস্থান মো. তৈমুর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে তার আইনজীবীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত নয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা বা প্রক্রিয়াগত বিষয়কে অনেক সময় ভুলভাবে অনিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
প্রশাসনের ভূমিকা ও প্রশ্ন সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়গুলো তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো সংস্থায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় নজরদারি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
তাদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না, তবে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও তদন্ত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল–৪–কে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখনো মূলত বিভিন্ন পক্ষের দাবি, নথি ও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগগুলোর কতটুকু সত্য এবং কতটুকু প্রমাণযোগ্য—তা নির্ধারণ করবে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া।
এদিকে সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক মহলে।