হাবিবুর রহমান, জামালগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬ বিকাল ০৫:৪৮:০৪
টানা ভারী বর্ষণে ডুবছে হাওর, ভেঙে গেছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন
টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চল ডুবে যাচ্ছে। এতে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ফসলহানিতে হাওরপারের মানুষের মধ্যে নেমে এসেছে চরম হতাশা ও দিশেহারা অবস্থা। চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে সারা বছরের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বোরো ধান।
প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও কৃষকরা বসে নেই। ঠান্ডা ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাতের আতঙ্ক আর ভারী বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা ছুটে যাচ্ছেন হাওরের দিকে। হাঁটু থেকে বুকসমান পানিতে নেমে ধান কেটে আনার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে অন্তত পরিবারের সারা বছরের খাদ্য জোগানের কিছুটা রক্ষা করা যায়।
জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওর, পাগনা, শনি ও মহালিয়াসহ ছোট-বড় বিভিন্ন হাওরের বিস্তীর্ণ জমি ইতোমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও পুরোপুরি ধান ডুবে গেছে, আবার কোথাও ডুবু ডুবু অবস্থায় রয়েছে। এক ফসলি এলাকা হওয়ায় কৃষকদের জন্য এটি জীবন-জীবিকার শেষ ভরসা।
হালির হাওরের কৃষক খালেক মিয়া জানান, “১৬ কেদার জমির মধ্যে মাত্র ২ কেদার ধান কেটে তুলেছি। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেগুলোও শুকাতে পারছি না, পচে যাচ্ছে। জমিতে পানি থাকায় মেশিন ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।”
শনির হাওরের কুকড়াপড়শী গ্রামের কৃষক রমজান আলী বলেন, “সব শেষ হয়ে গেল। ধারদেনা করে চাষ করেছি। এখন কীভাবে সংসার চলবে জানি না।”
পাগনার হাওরের কৃষক আমির আলী জানান, তার ২১ কেদার জমির মধ্যে ইতোমধ্যে ১৪ কেদার ধান তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বাকি জমিও ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষক ছত্তার বাদশা বলেন, “শ্রমিক না পেয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই পানিতে নেমে ধান কাটছি। জমি পানির নিচে থাকায় মেশিনও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। চোখের সামনে ফসল নষ্ট হচ্ছে, কিছুই করার নেই।”
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের অভিযোগ, শ্রমিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এক মন ধানেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট ও জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন ব্যবহারও বন্ধ রয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জামালগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ২৪ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যার লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন।
তবে কৃষি বিভাগের হিসাবে এখন পর্যন্ত অন্তত সাড়ে ৬০০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা জানান, “বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।”
এদিকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি এবং তা হাজার হেক্টরেরও বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে হাওরাঞ্চলে বড় ধরনের খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।