বর্ষার মধ্যে তড়িঘড়ি কার্পেটিংয়ের অভিযোগ; নিম্নমানের কাজ নিয়ে ক্ষোভ, নতুন করে নির্মাণের দাবি এলাকাবাসীর
রুহুল আমিন কিবরিয়া, বগুড়া জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬ বিকাল ০৩:৪৩:২৮
৬৫ লাখ টাকার সড়ক এক সপ্তাহেই নষ্ট, হাতের টানেই উঠে যাচ্ছে পিচ
মাত্র এক সপ্তাহ আগে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। অথচ এরই মধ্যে হাতের টানেই উঠে যাচ্ছে সড়কের পিচ, পা দিয়ে সামান্য ঘষলেই ঝরে পড়ছে বিটুমিন ও পাথরের খোয়া। প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের মানিকচক বাজার–কুটুরবাড়ী সড়কের এমন চিত্র দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি অর্থবছর শেষ হওয়ার তাড়াহুড়োয় বর্ষাকালের প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই কাদা ও ধুলাবালির ওপর নামমাত্র বিটুমিন ছিটিয়ে কার্পেটিং করা হয়েছে। ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই সড়কটির বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে যেতে শুরু করেছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী বিভাগ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬৫০ মিটার দীর্ঘ এ সড়কের উন্নয়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৬৯ লাখ ৮ হাজার ৪৫৬ টাকা। দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নন্দীগ্রামের মেসার্স অঙ্কন এন্টারপ্রাইজ ৬৫ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩ টাকায় কাজটি পায়। কাজের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ঝুলে থেকে শেষ পর্যন্ত জুন মাসের শেষ দিকে বর্ষার মধ্যেই তড়িঘড়ি করে কার্পেটিং সম্পন্ন করা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিংয়ের আস্তরণ আলগা হয়ে গেছে। কোথাও হাত দিয়ে টান দিলেই পিচ উঠে আসছে, আবার কোথাও পাথরের খোয়া ছড়িয়ে রয়েছে। কয়েকটি স্থানে খালি পায়ে হাঁটাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, "বহু প্রতীক্ষার পর একটি ভালো রাস্তা পেয়েছিলাম। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি নষ্ট হয়ে গেল। আমরা টেকসই রাস্তা চেয়েছিলাম, লোক দেখানো কাজ নয়।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী অভিযোগ করেন, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি তাদের ভয়ভীতি দেখিয়েছেন।
এদিকে কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদার আল মোমিন জানান, তিনি কাজটি অন্যের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। বিএনপি নেতা ও গাবতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম হেলাল দাবি করেন, তাঁর নামে কাজ নেওয়া হলেও বাস্তবে তাঁর শ্যালক মোনারুল ইসলাম টুটুল কাজটি সম্পন্ন করেছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, পুরো কাজেই হেলালের প্রতিনিধিরা তদারকিতে ছিলেন।
জাহিদুল ইসলাম হেলাল বলেন, এলজিইডির কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই কাজ হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে এলে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে।
রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক রেজা জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি সড়কটি পরিদর্শন করেছেন এবং বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও এলজিইডিকে অবহিত করেছেন।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র)-এর সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, বর্ষা মৌসুমে বিটুমিনভিত্তিক কার্পেটিং করা উচিত হয়নি। তাঁর মতে, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত নয়, শর্ত অনুযায়ী পুরো কার্পেটিং তুলে নতুন করে নির্মাণ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে এলজিইডির সদর উপজেলা প্রকৌশলী মোবারক হোসেন বলেন, জুনের শেষ দিকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরদিন থেকেই টানা বৃষ্টি শুরু হওয়ায় সড়কটি ঠিকভাবে শুকাতে পারেনি। পরিদর্শনে কিছু ত্রুটি পাওয়া গেছে। ঠিকাদারকে নিজস্ব খরচে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ব্যক্তি শাবল ও কোদাল দিয়ে সড়কের কিছু অংশ খুঁচিয়ে তুলেছেন, যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।