সাইফুল ইসলাম সুমন, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬ রাত ০৯:২০:৩৪
শ্রীমঙ্গলে পর্দা নামলো তিন দিনব্যাপী হারমোনি ফেস্টিভ্যালের জমকালো আয়োজন
বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি, জাতিগত বৈচিত্র্য ও সম্প্রীতির অনন্য বন্ধনকে নতুনভাবে তুলে ধরে শ্রীমঙ্গলে শেষ হয়েছে তিন দিনব্যাপী হারমোনি ফেস্টিভ্যাল (সিজন-২)। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবের পর্দা নেমেছে বর্ণাঢ্য আয়োজন ও ব্যাপক দর্শক সমাগমের মধ্য দিয়ে।
রোববার (২১ জুন) রাত পৌনে ১০টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে উৎসব প্রাঙ্গণ ছিল প্রাণচঞ্চল। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশকে সামনে রেখে এ আয়োজন করা হয়।
সিলেট অঞ্চলে বসবাসরত ২৭টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার সমন্বয়ে সাজানো হয় এবারের উৎসব। খাসিয়া, গারো, মনিপুরি, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, ওরাও, মুন্ডা, ভূমিজ, গৌড়, তেলেগুসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে উৎসবটি বৈচিত্র্যের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
উৎসবে নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, লোকসংগীত, ধর্মীয় আচার, হস্তশিল্প, পোশাক, সাংস্কৃতিক স্মারক এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের তৈরি হস্তশিল্প, হাতে বোনা পোশাক ও স্থানীয় পণ্যের স্টলগুলোতে ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়।
আয়োজকরা জানান, হারমোনি ফেস্টিভ্যাল শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহাবস্থান ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
পর্যটন সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ শ্রীমঙ্গলকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবে টেকসই সাংস্কৃতিক পর্যটনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ‘কমিউনিটি-বেসড ট্যুরিজম’ ধারণা তুলে ধরা হয়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “খুব শিগগিরই আমরা হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-৩ দেখতে যাচ্ছি। সিলেট অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে এক মঞ্চে তুলে ধরতে পেরে আমরা গর্বিত। আগামীতে আরও বড় পরিসরে এবং আরও সুন্দরভাবে এ আয়োজন করা হবে।”
সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সালেহা বিনতে সিরাজ বলেন, “হারমোনি ফেস্টিভ্যালের মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্য ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা। ভবিষ্যতে আরও নান্দনিক ও ঐতিহ্যনির্ভর আয়োজনের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হবে।”
তিনি আরও জানান, আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারির দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-৩ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। শীতকালকে কেন্দ্র করে আরও বৃহৎ পরিসরে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তিন দিনের এই আয়োজন কেবল বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল সংস্কৃতি সংরক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ভবিষ্যতেও এ উৎসব দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা-বাগান এলাকায় প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এ উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগাম ভ্রমণ পরিকল্পনা সহজ হবে এবং স্থানীয় পর্যটন শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে।
২৭টি নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালি সংস্কৃতির মনোমুগ্ধকর সমন্বয়ে আয়োজিত এ উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও এর সম্প্রীতির বার্তা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও আনন্দঘন স্মৃতি দীর্ঘদিন দর্শনার্থীদের মনে অম্লান হয়ে থাকবে।