শফিকুজ্জামান সোহেল, গঙ্গাচড়া, রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬ দুপুর ০১:৪৭:৪৪
তিস্তার ভাঙনে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধেই ফাটল, আতঙ্কে গঙ্গাচড়ার চরাঞ্চল
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তাপাড়ের চরাঞ্চলের মানুষ ভাঙনের হাত থেকে বসতভিটা রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরেই লড়াই করে আসছেন নিজেদের শক্তিতে। সরকারি সহায়তার আশায় বারবার দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কার্যকর ব্যবস্থা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছাশ্রম আর চাঁদার টাকায় বাঁধ নির্মাণ করেন তারা। তবে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই সেই বাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিন বছর আগে ভয়াবহ বন্যার সময় তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। ওই সময় গঙ্গাচড়ার বাগডোহরা চরের নিচাপাড়া এলাকার তিন শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
শেষ পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নোহালী ও বাগডোহরা এলাকার কয়েকটি চরগ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে চাঁদা তোলেন। পরে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে দুটি বাঁধ নির্মাণ করেন তারা। এর মধ্যে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার বৈরাতি থেকে বাগডোহরা মিনার বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাঁধের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি উজানে চর নোহালী এলাকায় ব্রিফ বাজার থেকে কাচারিপাড়া পর্যন্ত আরও দুই কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
চরবাসীর ভাষ্য, গত বছরের ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনে বাগডোহরা এলাকার দুই শতাধিক একর আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে যায়। তবে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধ দুটির কারণে অন্তত বসতভিটা রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর বর্ষা শুরুর আগেই ভারী বৃষ্টিতে বাঁধের বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এতে গঙ্গাচড়ার নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী, বাগডোহরা এবং ভাটির দিকে কোলকোন্দ ইউনিয়নের চিলাখাল, মটুকপুর ও বিনবিনা এলাকার অন্তত ১২ হাজার পরিবার চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে আসন্ন বর্ষায় বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। হুমকির মুখে রয়েছে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।
স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ আলী বলেন, “তিস্তার ভাঙনে আমার জীবনে নয়বার বাড়ি হারিয়েছি।
এখন চর বাগডোহরায় আছি। এই বাঁধটাই আমাদের শেষ ভরসা। এটি ভেঙে গেলে আর কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না।”
নোহালী ইউনিয়নের ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মশিয়ার রহমান বলেন, “এই বাঁধ রক্ষা করতে না পারলে বাগডোহরা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিস্তীর্ণ এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছি।”
এদিকে গত বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত ব্রিফ বাজার-কাচারিপাড়া বাঁধের অন্তত ২০০ ফুট অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধে সরাসরি কাজ করার সুযোগ সীমিত।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, “স্থানীয়দের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও সহায়তা দেওয়া হবে।”