নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ রাত ১১:১১:২১
প্রকল্প নিয়ন্ত্রণে ঘাটতিতেই বাড়ে সময় ও ব্যয়: প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ
দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি এখন বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়ে বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা।
তাঁরা বলেন, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মাধ্যমে নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বুধবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে আয়োজিত “ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পে প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের মৌলিক ধারণা” শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। আইইবির কেমিকৌশল বিভাগের উদ্যোগে বিকেল ৫টায় সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, দেশের শিল্পখাতে—বিশেষ করে পোশাকশিল্পের রং করা, ধোয়া ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায়—বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহৃত হয়। উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে শিল্পে পানির ব্যবহার অনেক বেশি হওয়ায় একদিকে অপচয় বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তিনি বলেন, পানি পুনর্ব্যবহার, কম পানি ব্যবহারকারী প্রযুক্তি এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অপচয় কমানো সম্ভব। টেকসই শিল্পায়নের জন্য পানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায়ই সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অতীতে কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং কার্যকর প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইইবির সভাপতি ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, প্রকল্পের সাফল্যের জন্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে একটি প্রকল্পের বাস্তবতা, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উপযোগিতা নির্ধারণ করা হয়।
তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা ও গবেষণা করলেও বাস্তবায়ন করে তুলনামূলক কম সময়ে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনার তুলনায় বাস্তবায়নে ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, ফলে ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলের উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, প্রকল্প পরিকল্পনার শুরুতেই বাস্তবসম্মত বাজেট ও সময়সীমা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হয় এবং ব্যয় বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, শিল্পখাতে পরিবেশ সুরক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন না থাকায় অপরিশোধিত বর্জ্য নদী ও জলাশয়ে গিয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। টেকসই শিল্পায়নের জন্য পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান স্বাগত বক্তব্যে বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের সময় যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবায়নের সময় তার সঙ্গে বড় ধরনের অমিল দেখা যায়। ফলে বারবার সময় ও ব্যয় সংশোধন করতে হয়, যা জাতীয় অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আর্থিক বাস্তবতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে বাস্তবায়নকালে নির্ধারিত সময় ও বাজেট কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শেভরন বাংলাদেশের বেস বিজনেস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স ম্যানেজার প্রকৌশলী বিপ্লব কুমার ধর। তিনি বলেন, প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সময়, ব্যয়, গুণগত মান ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির কেমিকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী সালমা আখতার। সঞ্চালনা করেন বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী মো. শাওকাত ফেরদৌস এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিভাগের ভাইস চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. ইদ্রিস আলী।
অনুষ্ঠানে আইইবি সদর দপ্তর ও ঢাকা কেন্দ্রের নেতৃবৃন্দ, কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য, বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।