নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬ সকাল ১০:৪৫:০৪
গবেষণাগার থেকে সমাজে প্রয়োগেই এআইয়ের সাফল্য: আইইবি সেমিনারে বক্তারা
গবেষণাগারে উদ্ভাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা। তাঁদের ভাষ্য, গবেষণালব্ধ জ্ঞান স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও নগর ব্যবস্থাপনায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে তবেই এআইয়ের প্রকৃত সামাজিক প্রভাব নিশ্চিত হবে।
রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে সোমবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত ‘Translational Artificial Intelligence: From Research to Societal Impact’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। আইইবির উইমেন ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টার এ সেমিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা (পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি) ডা. জাহেদ-উর রহমান বলেন, মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবায় এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তিনি বলেন, অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের আচরণ বিশ্লেষণ, মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং থেরাপি কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষত এআই বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের ওপরও জোর দেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (এ্যাব)–এর আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে এআই বিভিন্ন খাতে আধুনিক সেবা নিশ্চিত করছে। তিনি স্মার্ট সিটি ব্যবস্থাপনায় এআই ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, উন্নত ক্যামেরা, সেন্সর ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শহরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে শিল্প খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে এআই ও রোবট প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, নকশা, কাটিং ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এ প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দক্ষতা বাড়াচ্ছে। তবে প্রযুক্তিনির্ভরতা ও কর্মসংস্থানে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটারকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী তানজিমা হাশেম। তিনি বলেন, গবেষণাগারে উদ্ভাবিত এআই প্রযুক্তি যখন বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে ব্যবহার হয়ে সমাজ ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে, তখনই সেটিকে ‘ট্রান্সলেশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বলা হয়।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে রোগ নির্ণয়, মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণ ও ওষুধ উদ্ভাবনে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষিতে মাটি, আবহাওয়া ও ফসলসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও রোগ শনাক্তকরণ সহজ হচ্ছে। একইভাবে শিক্ষা খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার ব্যবস্থাও এআইভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিস্তৃত হচ্ছে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির সভাপতি ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু)। তিনি নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির প্রয়োগের পাশাপাশি ভবনের অনুমোদিত পার্কিং ব্যবস্থার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাষ্য, নির্ধারিত পার্কিং স্থান অন্য কাজে ব্যবহার করায় নগর এলাকায় যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে। সেমিনার থেকে আসা সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে পাঠিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
ধন্যবাদ জ্ঞাপনে আইইবির উইমেন ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শাহানাজ শারমিন বলেন, গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করাই ট্রান্সলেশনাল এআইয়ের মূল উদ্দেশ্য। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, নগর ব্যবস্থাপনা ও জনসেবায় এর বাস্তব প্রয়োগ ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার ২০২৬–২০৩৬ মেয়াদের জন্য এআই–সংক্রান্ত নীতিমালা ও পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে, যা সময়োপযোগী পদক্ষেপ। ভবিষ্যতের আধুনিক বাংলাদেশ গঠনে এআই, ডাটা সায়েন্স, রোবোটিকস ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকল্প নেই। তবে প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করাও জরুরি।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উইমেন ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টারের সম্পাদক প্রকৌশলী ইশরাত জাহান। তিনি বলেন, ট্রান্সলেশনাল এআইয়ের মূল লক্ষ্য গবেষণায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। স্বাস্থ্যসেবায় এআই এখন রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করছে, দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ডাক্তারদের সাহায্য করছে। কৃষিক্ষেত্রে এআই আবহাওয়া ও মাটির তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষকদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করছে। একইভাবে, শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ব্যবস্থা, এমনকি দুর্যোগ পূর্বাভাসেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সেমিনারে আইইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট (এইচআরডি) প্রকৌশলী শেখ আল আমিন, ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী এ.টি.এম তানবীর-উল হাসান (তমাল), সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল, সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ ওসমানীসহ আইইবির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা কেন্দ্রের নেতারা, উইমেন ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টারের নেত্রীবৃন্দসহ, বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন প্রকৌশল সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।