নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬ রাত ০৬:১৫:৫১
সড়ক নিরাপত্তায় এক বছরের কর্মপরিকল্পনা চান ইলিয়াস কাঞ্চন
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে সড়ক নিরাপত্তায় এক বছরের পূর্ণাঙ্গ, সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন।
তিনি বলেন, ২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ করে পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ঘাটতির হিসাব দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করতে হবে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেওয়া এক বার্তায় দেশবাসী, নিসচার নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও সড়ক ব্যবহারকারীদের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সড়ক নিরাপত্তায় কী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, কোন সংস্থা কখন কোন কাজ করবে এবং অগ্রগতি কীভাবে যাচাই করা হবে, তা কর্মপরিকল্পনায় স্পষ্ট থাকতে হবে। পরবর্তী বছরের ২২ অক্টোবর গত এক বছরের কাজের প্রকাশ্য মূল্যায়ন করতে হবে। কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কেন লক্ষ্য পূরণ হয়নি, সেসব তথ্যও দেশবাসীকে জানাতে হবে।
তিনি বলেন, এভাবে প্রতি বছর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও সংশোধনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক দিবস হয়ে থাকবে না। বরং সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠবে। সরকারের প্রতি তার প্রত্যাশা, এবারের ২২ অক্টোবর থেকেই এক বছরের কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে এবং পরবর্তী দিবসে তার বাস্তব অগ্রগতি ও ঘাটতির হিসাব প্রকাশ করা হবে।
সড়ক দুর্ঘটনাকে নিয়তি বা দুর্ভাগ্য বলে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, চালকের ক্লান্তি বা অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অনিরাপদ সড়ক, পথচারীদের নিরাপদে পারাপারের অভাব এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার মতো ঝুঁকি রয়েছে। এসব ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাজারের কাছে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে পথচারীদের জন্য দখলমুক্ত ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, পর্যাপ্ত সড়কবাতি ও স্পষ্ট নির্দেশক নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা কার্যকর করার পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক ও টায়ার, অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তার মতে, চালকের লাইসেন্স দেওয়ার আগে দক্ষতা যাচাই ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পেশাদার চালকদের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের নিয়মও কার্যকরভাবে মানতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, দায়িত্ব বণ্টন ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনার ওপর জোর দেন নিসচা চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কোথায় ও কখন দুর্ঘটনা ঘটছে, কারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং দুর্ঘটনার কারণ কী, তা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুর্ঘটনার পর শুধু দায়ী ব্যক্তি শনাক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। দুর্ঘটনার পেছনে সড়ক, যানবাহন, পরিবহন পরিচালনা ও তদারকির যেসব ত্রুটি রয়েছে, সেগুলোও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে বলে আহ্বান জানান।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ১৯৯৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারানোর পর তিনি মানুষের জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে নিরাপদ সড়ক চাই প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে ২২ অক্টোবরকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালনের মধ্য দিয়ে সংগঠনটি সড়ক নিরাপত্তার দাবি তুলে ধরে। নিসচার দীর্ঘ আন্দোলন ও দাবির ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে সরকার দিনটিকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা করে।
নিসচার ইতিহাস ও অবদান আড়াল করা কিংবা জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের তাৎপর্য বিকৃত করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ত্যাগ ও প্রামাণ্য ইতিহাসকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। এ বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে তথ্য, নথি ও সত্যের ভিত্তিতে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দেশে না থাকলেও নিসচার কাজ থেমে থাকবে না উল্লেখ করে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, নিসচার ইতিহাস ও আদর্শ ধারণ করে তথ্যভিত্তিকভাবে কথা বলতে হবে এবং সড়ক নিরাপত্তার আন্দোলন আরও জোরদার করতে হবে।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আহত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি। একই সঙ্গে সরকার, পরিবহনমালিক-শ্রমিক, চালক, যাত্রী, পথচারী, গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে সড়ক নিরাপত্তায় কাজ করার আহ্বান জানান।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়কে প্রতিটি জীবন মূল্যবান। দুর্ঘটনাকে নিয়তি হিসেবে মেনে না নিয়ে ঝুঁকি চিহ্নিত করা, আইন প্রয়োগের দাবি তোলা এবং নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে মানুষের জীবন রক্ষা করতে হবে।