মো. আরিফ হোসেন চৌধুরী
প্রকাশ : ৩ আগস্ট ২০২৬ রাত ১১:২৮:৩০
শাহজালালে অ্যাপ্রোন দখল করে রাখা পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ নিলামে তুলতে চায় বেবিচক
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ্রোন এলাকায় প্রায় এক দশক ধরে পড়ে থাকা ১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ অবশেষে বাজেয়াপ্ত করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এখন এগুলো আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্ক্র্যাপ (ভাঙারি) হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বেবিচক সূত্র জানায়, একসময় দেশের আকাশে চলাচল করা এসব উড়োজাহাজ দীর্ঘদিন অযত্নে খোলা পরিবেশে পড়ে থাকায় কার্যত লোহালক্কড়ে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে, মরিচা ধরেছে কাঠামোতে। ফলে এগুলো আর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী নয়।
অ্যাপ্রোন দখলে ব্যাহত কার্গো কার্যক্রম
বর্তমানে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ৮টি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ২টি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের ১টি এবং অ্যাঞ্জেল এয়ারওয়েজের ১টিসহ মোট ১২টি উড়োজাহাজ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো অ্যাপ্রোনে পড়ে রয়েছে।
এসব উড়োজাহাজ প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট মূল্যবান অপারেশনাল এলাকা দখল করে রেখেছে। ফলে কার্গো কার্যক্রম, উড়োজাহাজ পার্কিং, রপ্তানি পণ্য ওঠানামা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিমানবন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না এবং সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ভিত্তিমূল্য নয়, সরাসরি আন্তর্জাতিক দরপত্র
বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এসব উড়োজাহাজের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করতে যে ব্যয় হবে, তা বিক্রি থেকে সম্ভাব্য আয়ের চেয়েও বেশি হতে পারে। তাই প্রচলিত মূল্য নির্ধারণের পরিবর্তে কোনো ভিত্তিমূল্য ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলাম করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক গত ১৬ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর বাজেয়াপ্ত
উড়োজাহাজগুলোর এয়ারওয়ার্থিনেস সার্টিফিকেটের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে যায়। পরে আইন অনুযায়ী সেগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়। নিবন্ধন বাতিলের পর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে একাধিকবার উড়োজাহাজ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বেবিচক ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ জারি করে। সেখানে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়োজাহাজ সরানো না হলে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করা হবে।
পরে বিষয়টি সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বন্ধক গ্রহণকারী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়।
সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২৪ সালের ২৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ১২টি উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্ত করে বেবিচক।
মূল্য নির্ধারণেই সবচেয়ে বড় জটিলতা
বেবিচক বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সহায়তা চাইলেও দেশে আন্তর্জাতিক মানে উড়োজাহাজ মূল্যায়নে সক্ষম কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হলেও সম্ভাব্য ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় সেই উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা যায়নি।
এ কারণে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক দর পাওয়ার কৌশল নিয়েছে সংস্থাটি।
যা বললেন বেবিচক
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন,
"দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজ বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। এগুলো ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। মূল্য নির্ধারণে যে ব্যয় হবে, বিক্রি করে সেই অর্থ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। বাস্তবে এগুলো এখন স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে।"
বিশেষজ্ঞদের মত
বিমান খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল্যবান অ্যাপ্রোন দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত উড়োজাহাজে দখল হয়ে থাকা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। এতে কার্গো কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অপারেশনাল সক্ষমতা কমছে এবং সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে।
তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে দ্রুত উড়োজাহাজগুলো অপসারণ করা গেলে একদিকে যেমন বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে বহুদিনের অচলাবস্থারও অবসান ঘটবে।