রমজানে ওজন বৃদ্ধি ও বদহজম এড়ানোর উপায়
রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়—এটি শরীর ও মনকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার এক অনন্য সুযোগ। কিন্তু দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর ইফতারের টেবিলে বসে অনেকেই অজান্তেই অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন। ফল হিসেবে রমজান শেষে দেখা দেয় ওজন বৃদ্ধি, বদহজম, গ্যাস্ট্রিক, বুকজ্বালা কিংবা সারাক্ষণ ক্লান্তিভাব।সারাদিন উপবাসের ফলে শরীরের শক্তির মজুত কমে আসে। এ সময় ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য বদলে যায়, ফলে মস্তিষ্ক দ্রুত শক্তি পাওয়ার সংকেত পাঠায়। তখন তেলেভাজা, মিষ্টি বা ভারী খাবারের প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।এছাড়া পাকস্থলী ভরে গেছে—এই তথ্য মস্তিষ্কে পৌঁছাতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। এর আগেই অনেক খাবার খাওয়া হয়ে যায়। পারিবারিক আড্ডা, ঐতিহ্যবাহী ইফতার আর আবেগ মিলে এই প্রবণতা আরও বাড়িয়ে তোলে।ধীরে ইফতারই সুস্থতার প্রথম ধাপবিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতার শুরু করার পদ্ধতিই পুরো রাতের হজম ও ক্যালরি গ্রহণ নির্ধারণ করে।দুই থেকে তিনটি খেজুর ও এক গ্লাস পানি দিয়ে ইফতার শুরু করুন। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে স্বাভাবিক হয়। এরপর ১০–১৫ মিনিট বিরতি দিয়ে হালকা কিছু খান—যেমন স্যুপ, ফল বা সালাদ।এই বিরতিতে পাকস্থলী প্রস্তুত হয়, হজমের চাপ কমে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।সুষম খাবার মানেই কম খাবার নয়, সঠিক খাবাররমজানে খাবার কমানোর চেয়ে ঠিকভাবে সাজানো প্লেট বেশি গুরুত্বপূর্ণ।খাবারের অর্ধেক অংশ রাখুন শাকসবজি ও সালাদে। এক-চতুর্থাংশে রাখুন প্রোটিন—মাছ, ডিম, ডাল, ছোলা বা দই। বাকি অংশে থাকুক গোটা শস্য—রুটি, ওটস বা অল্প পরিমাণ ভাত।এই সমন্বয় দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে, রক্তে শর্করার ওঠানামা কমায় এবং অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি জমতে দেয় না।মনোযোগী খাওয়া: নীরব অভ্যাস, বড় উপকারঅনেক সময় ক্ষুধার কারণে নয়, বরং অভ্যাসের কারণে আমরা বেশি খাই। টিভি দেখা, মোবাইল স্ক্রল করা বা গল্প করতে করতে খেলে মস্তিষ্ক বুঝতেই পারে না কতটা খাওয়া হয়েছে।খাওয়ার সময় মনোযোগ দিন খাবারের দিকে। ধীরে চিবিয়ে খান, স্বাদের অনুভূতি নিন। পেট অর্ধেক ভরলেই থামুন। এতে হজম সহজ হয় এবং শরীর প্রয়োজনের বেশি খাবার জমাতে পারে না।ভাজা ও মিষ্টি—পুরোপুরি নয়, সীমিত করুনরমজানের ইফতার ভাজা ও মিষ্টি ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। এগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দরকার নেই। তবে এগুলোকে ইফতারের মূল খাবার না বানিয়ে পরিপূরক হিসেবে রাখুন।ভাজা খাবার প্রতিদিন না খেয়ে সপ্তাহে এক–দুদিন সীমিত রাখুন। সিরাপজাত মিষ্টির বদলে ফল, দই বা অল্প মধু ভালো বিকল্প হতে পারে।সেহরি: সারাদিনের নিয়ন্ত্রকসেহরি বাদ দিলে ইফতারে অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ সেহরি সারাদিন ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখে।ওটস, ডিম, দই, ফল, বাদাম ও সবজি দিয়ে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর সেহরি হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর। পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি, যাতে দিনভর পানিশূন্যতা না হয়।বিশেষজ্ঞের মতবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়-এর আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন,“রমজানে অসুস্থ হওয়ার প্রধান কারণ অতিরিক্ত তেল, চিনি ও একসঙ্গে অনেক খাবার গ্রহণ। অল্প পরিমাণে, ধীরে এবং সুষমভাবে খেলে রোজা শরীরের জন্য উপকারী হয়ে ওঠে।”সংযমেই সুস্থতারমজান সংযমের শিক্ষা দেয়—খাবারেও তার ব্যতিক্রম নয়। প্লেট ছোট রাখুন, গতি কমান, প্রয়োজনের কথা ভাবুন। এতে ওজন বাড়বে না, বদহজম কমবে এবং রোজার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য আরও গভীর হবে।সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন—রমজান হোক শরীর ও মনের জন্য প্রশান্তির মাস।