রাকিবুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর:
প্রকাশ : ৮ এপ্রিল ২০২৬ রাত ০৭:২২:১০
চিকিৎসক সংকটে মুখ থুবড়ে লক্ষ্মীপুরের উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো
লক্ষ্মীপুর জেলায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোর করুণ চিত্র জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। জেলার ৩৫টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকদের পদায়ন থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক চিকিৎসক শুধু অফিসে এসে স্বাক্ষর করে দ্রুত জেলা শহরে ফিরে যান। বুধবার (৮ এপ্রিল) রায়পুর উপজেলার একটি কেন্দ্রে এমনই একটি ঘটনার অভিযোগ ওঠে। সেখানে মেডিকেল অফিসার ডা. আবদুল্লাহ আল নোমান সকালে উপস্থিত হয়ে স্বাক্ষর দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই চলে যান বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, গত তিন বছর ধরেই তিনি দায়িত্ব পালনে অনিয়ম করে আসছেন।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ৬১৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১৬৫টি পদ শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে সহকারী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও ফার্মাসিস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
শুধু জনবল সংকট নয়, অধিকাংশ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অবকাঠামোগত অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ২০১৯ সালে কিছু সংস্কার কাজ হলেও বর্তমানে অনেক কেন্দ্রই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও দরজা-জানালা পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে।
রায়পুরের চরপাতা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাই রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন। এতে অনেক রোগী কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
একই চিত্র জেলার অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও বিরাজ করছে। অনেক স্থানে প্রসূতি সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে রায়পুরের সোনাপুরসহ কয়েকটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। সরকারি নথিতে চালু থাকলেও বাস্তবে সেগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা পারুল বেগম বলেন, “আগে মাঝে মাঝে একজন চিকিৎসক আসতেন, কিন্তু এখন আর কাউকে দেখা যায় না।”
অন্যদিকে মাহফুজা বেগম জানান, “এখানে শুধু সাধারণ কিছু ওষুধ দেওয়া হয়, কিন্তু কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পাওয়া যায় না।”
রায়পুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কর্মকর্তা জিয়াউল কাদের বাবলু বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে নিয়মিত কর্মস্থলে দেখেননি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। একইভাবে অন্যান্য অভিযুক্ত চিকিৎসকরাও অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তারা চিকিৎসক সংকট ও অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত নতুন নিয়োগের আশ্বাস পাওয়া গেছে।
প্রতিদিন প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ মানুষ এসব উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক সংকট, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে তারা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।