রুহুল আমিন কিবরিয়া, বগুড়া জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ০৬:৪৪:১৩
বগুড়ায় বিচারকের এজলাসে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের হট্টগোল
বগুড়ায় দুই বছর আগে প্রত্যাহার হওয়া এক বিচারক পুনরায় জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে যোগ দেওয়ার পর তাঁর আদালত বর্জনকে কেন্দ্র করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান। পরে আদালত পুলিশ গিয়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বগুড়া আদালতের কর্মচারী ও আইনজীবীরা তৎকালীন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুজ্জামান এবং জেলা ও দায়রা জজ মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। পরে দুজনকেই বগুড়া থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে জেলা ও দায়রা জজ মোজাম্মেল হককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
এর মধ্যে মনিরুজ্জামান জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতি পেয়ে বগুড়ায় বদলির আদেশ পান। বুধবার তিনি বগুড়ায় যোগ দিয়ে দুপুরের দিকে এজলাসে বসেন।
এ সময় বগুড়া অ্যাডভোকেটস বার সমিতির নেতারা তাঁর আদালত বর্জনের ঘোষণা দিয়ে এজলাসে মামলার শুনানিতে বাধা দেন। তবে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের অপর একটি পক্ষ মামলার শুনানি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিচারক এজলাস ত্যাগ করে খাসকামরায় চলে যান। পরে পুলিশ গিয়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়।
বগুড়া অ্যাডভোকেটস বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, মনিরুজ্জামান বগুড়ায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবহ বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন। বিএনপির নেতা-কর্মীদের জামিন না দিয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখার অভিযোগে ৫ আগস্টের পর আইনজীবী ও আদালতের কর্মচারীরা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
রফিকুল ইসলাম বলেন, বগুড়া থেকে প্রত্যাহারের পর আবার জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে তাঁর বদলির খবর পেয়ে তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করে বদলির আদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বগুড়ায় যোগ দিলে আদালত বর্জনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বুধবার বিচারক এজলাসে বসে মামলার শুনানি শুরু করলে তাঁরা সেখানে বাধা দিতে যান। এ সময় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য ও শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে কয়েকজন জুনিয়র আইনজীবী তাঁদের সঙ্গে হট্টগোলে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে বার সমিতির সভাপতি রেজাউর রহমানকে ধাক্কা দিয়ে এজলাস থেকে বের করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আইনজীবী আব্দুল ওয়াহাব। তিনি জানান, আদালত বর্জনের কর্মসূচির সঙ্গে তাঁরাও একমত ছিলেন। জেলা ও দায়রা জজ যোগদানের পর বার সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁর খাসকামরায় যান। পরে বিচারক এজলাসে বসেন।
আব্দুল ওয়াহাবের দাবি, একটি মামলার শুনানি শেষে বার সমিতির নেতারা আবার এজলাসে এসে বাধা দেন। আদালত বর্জনের কর্মসূচি থাকলে বার সমিতির নেতারা বিচারকের খাসকামরায় কেন গিয়েছিলেন—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, বার সমিতির নেতারা বের হওয়ার পর বিচারক এজলাসে বসলে তাঁরা জুনিয়র আইনজীবীরা মামলার শুনানি শুরু করেন। পরে বার সমিতির নেতারা বাধা দিতে এলে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে রফিকুল ইসলামের দাবি, বিচারকের খাসকামরায় তাঁরা আদালত বর্জনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানাতেই গিয়েছিলেন। বিচারক নিয়ম রক্ষার জন্য একটি মামলার শুনানি করে কার্যক্রম স্থগিত রাখবেন বলে তাঁদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে একটি হত্যা মামলায় আসামির জামিনসহ আরও মামলার শুনানি শুরু করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, তিনি ১৯৮৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বগুড়া জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে সংগঠনটির উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন বলেও জানান তিনি। তাঁর দাবি, বার সমিতির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কয়েকজন জুনিয়র আইনজীবী এজলাসে হট্টগোল করেছেন এবং সভাপতিকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন।
বগুড়া আদালত পুলিশের পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম বলেন, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষে আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল শুরু হলে পুলিশ সেখানে গিয়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।