জাহাঙ্গীর আলম, নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৮ জুলাই ২০২৬ বিকাল ০৪:৪৫:৪১
নেত্রকোনায় ধর্ষণ মামলার ১৩ বছর পর রায়, আসামির যাবজ্জীবন
নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার বহুল আলোচিত একটি ধর্ষণ মামলায় ১৩ বছর পর রায় দিয়েছেন আদালত। মামলার একমাত্র আসামি হেলালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে নেত্রকোনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ড. এমদাদুল হক এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালত ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১ মার্চ রাতে বারহাট্টা উপজেলার নিজ বসতঘরে স্বামী-পরিত্যক্তা ও মানসিকভাবে সরল প্রকৃতির এক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন আসামি হেলাল। এ ঘটনায় ওই বছরের ১৩ জুলাই বারহাট্টা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পরে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ অক্টোবর পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে।
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার সময় ভুক্তভোগী তার দুই মেয়েকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে আসামি ঘরের বাঁশের দরজা খুলে প্রবেশ করে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এবং বিষয়টি প্রকাশ করলে হত্যার হুমকি দেয়। ভুক্তভোগীর ছোট মেয়ে ও পাশের ঘরের এক স্বজন ঘটনাস্থল থেকে আসামিকে বের হয়ে যেতে দেখেছেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা এবং বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আসামি ধর্ষণের ঘটনা ও অনাগত সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, শিশুটির জৈবিক পিতা হেলাল।
মামলা চলাকালেই অভিযোগ দায়েরের প্রায় এক বছর পর ভুক্তভোগী নারী স্বাভাবিকভাবে মারা যান। এরপর ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া কন্যাশিশুটি, বর্তমানে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, আত্মীয়-স্বজনদের সহায়তায় দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে আদালতে পিতৃপরিচয় ও ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই চালিয়ে যায়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের পাবলিক প্রসিকিউর মো: নুরুল কবীর রুবেল জানান, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুটির পিতৃত্ব নিশ্চিত হয়েছে। ফলে তিনি হেলালের আইনগত সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী পিতার সম্পত্তিসহ অন্যান্য আইনগত অধিকারের দাবিদার হবেন।
আদালত ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেন। মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এ দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
তিনি আরো জানান, এই রায়ের মাধ্যমে শুধু একজন ধর্ষকের শাস্তিই নিশ্চিত হয়নি, বরং ডিএনএ পরীক্ষার ভিত্তিতে একটি শিশু তার পিতৃপরিচয়, সামাজিক স্বীকৃতি ও আইনগত অধিকার ফিরে পেয়েছে। এটি ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।