আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬ রাত ১০:৫৫:৩৫
যুদ্ধ বন্ধে চুক্তির দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির লক্ষ্যে দুই দেশের আলোচকেরা বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছেন। মঙ্গলবার দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনায় এই ইতিবাচক মোড় আসে বলে মার্কিন প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ খবর জানিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি চূড়ান্ত হয়, তবে বিস্তারিত আলোচনার জন্য বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়াতে হবে। একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিস্তারিত বিষয়গুলো বেশ জটিল, যা দুই দিনে শেষ করা সম্ভব নয়।’
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে কোনও সম্মতি দেয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২১ এপ্রিল বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় বাকি মতপার্থক্যগুলো দূর করে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বুধবার তেহরানে পৌঁছেছেন।
চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দল কাজ করে যাচ্ছে। এই দলে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, হোয়াইট হাউজের দূত স্টিভ উইটকফ এবং সিনিয়র উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। তারা মঙ্গলবার দিনভর ইরানি প্রতিনিধি ও মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ফোনে আলাপ এবং খসড়া প্রস্তাব বিনিময় করেছেন।
মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, তারা সব পক্ষের সঙ্গে ব্যাকচ্যানেলে যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং আমরা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছি। দ্বিতীয় এক কর্মকর্তাও মঙ্গলবার অগ্রগতির কথা নিশ্চিত করেছেন।
তৃতীয় মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা একটি চুক্তি চাই। ইরানের সরকারের একটি চুক্তি চায়। এখন মূল বিষয় হলো চুক্তিতে তাদের পুরো সরকারকে নিয়ে আসা।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জর্জিয়ায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, যাদের সঙ্গে আমরা আলোচনায় বসেছি, আমি মনে করি তারা চুক্তি করতে চায়। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী।
তবে ভ্যান্স সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে আলোচনা করছেন না।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ট্রাম্পের নৌ-অবরোধের কারণে ইরানের তেল রফতানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশটির গভীর অর্থনৈতিক সংকট, যা তেহরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা সরাসরি বলেছেন, ‘ইরানের কাছে কোনও টাকা নেই। তারা দেউলিয়া হয়ে গেছে। আমরা এটা জানি এবং তারাও জানে যে আমরা এটা জানি।’
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করে প্রায় ১৪ কোটি ডলার আয় করত। কিন্তু নৌ-অবরোধের কারণে এই আয় এখন শূন্যের কোঠায়। ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রফতানি হয় যে খার্গ দ্বীপ দিয়ে, সেটি এখন মার্কিন নজরদারিতে। মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আপাতত আমাদের খার্গ দ্বীপ দখল করার দরকার নেই, শুধু অবরোধ করে রাখলেই চলবে।’
যুদ্ধের ফলে ইরানের অর্থনীতি এখন ভেনেজুয়েলার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের দুটি বৃহত্তম ইস্পাত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়া ইসরায়েলি হ্যাকারদের সাইবার হামলায় ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সেপাহ ব্যাংক বিপর্যস্ত, যারা মূলত সামরিক বাহিনী ও আইআরজিসির বেতন পরিশোধ করে।
দেশটিতে টানা ৪৭ দিন ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রতিদিন আরও ৫ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, ইরান যদি তেল রফতানি করতে না পারে এবং তাদের মজুত রাখার জায়গা শেষ হয়ে যায়, তবে তেলকূপগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।