নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত ০৮:১১:০৮
জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে যা বললেন চরমোনাই পীর
শুরুতেই তিনি মহান রবের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ করেন। চরমোনাই পীরের পূর্ণাঙ্গ ভাষণ-
জাতির ভাগ্যের পরিবর্তনের প্রত্যাশায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী আমেজে থাকা প্রিয় দেশবাসীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করিম আপনাদেরকে জানাই শ্রদ্ধা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা।
বিট্রিশ বিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মানুষের মুক্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সংগঠিত সকল আন্দোলন ও সংগ্রামে অংশ নেয়া জাতির সাহসী সন্তানদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। বিশেষ করে শাপলা ও চব্বিশের গণঅভ্যূত্থানের সকল আহত, নিহত বীরদের প্রতি আমাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্পণ করছি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১৯৮৭ সালে দেশের সর্বধারার শীর্ষ উলামায়ে কেরাম, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্ল্যাটফর্ম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সকল রাজনৈতিক আন্দোলনে আমরা ছিলাম সম্মুখসারীর দল। দেশ-জাতি ও মানবতার স্বার্থে আমাদের সরব পদচারণায় মুখর ছিলো রাজপথ। সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যূত্থানে একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ স্বনামে-প্রকাশ্যে রাজপথে লড়াই করেছে।
প্রতিষ্ঠাকালে আমাদের দলের নাম ছিলো ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। কারণ সেই ১৯৮৭ সালেই আমাদের অনুধাবনে এটা ছিলো, যে সংবিধানে দেশ চলছে তা এই দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও বোধ-বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না। আজকের বাংলাদেশে সবাই একমত যে, সংবিধানই প্রধানতম সমস্যা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে আমরা সংবিধান সংস্কারসহ রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংস্কার করার একটি সুযোগ পেয়েছি। সেই সুযোগকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন তাৎপর্যপূর্ণ। আপনার একটি ভোট মহান স্বাধীনতা ও চব্বিশের জুলাই এর প্রত্যাশাকে বাস্তবায়িত করতে সহায়তা করবে, ইনশাআল্লাহ।
স্বাধীনতার পরে ৫৪টি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এক সাগর রক্ত উৎসর্গ করার পরেও আমরা কাক্সিক্ষত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার পাই নাই। আর্থিক সমৃদ্ধি আসে নাই, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় নাই। বরং দারিদ্রতা, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক হানাহানি, অবিচার, সীমাহীন বৈষম্য, বেকারত্ব আমাদের দেশকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে। অতিতে যারাই দেশ পরিচালনা করেছে তাদের কেউ-ই এই দায় এড়াতে পারবে না। এখানে ভোটার হিসেবে আমার-আপনার দায়ও রয়েছে। ভুল নীতি ও নেতাকে ভোট দেয়ার মাধ্যমে এর দায় আমাদের ওপরেও বর্তায়।
আমাদের সমস্যা ছিলো দুইটা। এক. রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হিসেবে ভুল নীতি গ্রহণ করা এবং দুই. ভুল নেতা বাছাই করা।
ভুল নীতির কারণে অনেক ভালো নেতাও দেশকে কাক্সিক্ষতমানে নিয়ে যেতে পারে নাই। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই ভূখণ্ডের মানুষের হাজার বছরের চর্চিত বিশ্বাস ও জীবনাচারের নীতি ইসলামকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। শরীয়াহ কেবলই একটি আইনের নাম নয় বরং শরীয়াহ হলো, মানুষের বিশ্বাস, জীবনবোধ, সংস্কৃতি, অভ্যাস ও আইনের সমষ্টি। আমরা এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস হিসেবে, জীবনবোধ হিসেবে এবং সংস্কৃতিতে, অভ্যাসে ইসলামকে ধারণ করি। এখন যদি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ইসলামকে বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলেই বাংলাদেশ তার প্রত্যাশিত সমৃদ্ধি ও লক্ষ খুঁজে পাবে; ইনশাআল্লাহ।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামের মৌলিক নীতিমালার মধ্যে রয়েছে আদালত, ইনসাফ, নাগরিকের স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতা, দায়বদ্ধতা, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং সকল ধর্মের মানুষের ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার ও সমান সন্মান-মর্যাদা প্রদান করা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে এই মৌলিক নীতিমালার পূর্ণ প্রতিপালন করবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫৮ আসনে হাতপাখা প্রতীকে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছে। আপনারা জানেন, প্রচলিত আইন ও বন্দোবস্তের মোকাবেলায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এ দেশের হাজার মানুষের বোধ বিশ্বাসের আলোকে ইসলামের নীতিতে দেশ পরিচালনার লক্ষ নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। আপনাদের থেকে যে স্বতঃস্ফ‚র্ত সাড়া আমরা পাচ্ছি। তা আমাদেরকে আল্পুত করছে। ইনশাআল্লাহ আগামী ১২ তারিখ আপনারা হাতপাখা প্রতীকে ভোট দিয়ে আমাদেরকে বিজয়ী করলে জনপ্রত্যাশার বাংলাদেশ নির্মাণ করবো, ইনশাআল্লাহ।
চরমোনাই পীর কুরআনের উদ্র ভোট অর্থ হলো, আপনি কাউকে আপনার হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া। ভোট অর্থ, কাউকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতর বলে সাক্ষ্য দেয়া। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, যে ভাল সুপারিশ করবে, তা থেকে তার জন্য একটি অংশ থাকবে এবং যে মন্দ সুপারিশ করবে তার জন্যও তা থেকে একটি অংশ থাকবে। সুরা আন নিসা-৮৫
এই আয়াতের অর্থ খুবই স্পষ্ট। আপনি যদি ভোটের মাধ্যমে কোন ভালো নীতি ও ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেন তাহলে সেই ভালো নীতি ও ব্যক্তির কৃত ভালো কাজের নেকি আপনি পাবেন। আর যদি আপনি কোন খারাপ নীতি ও ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেন তাহলে সেই খারাপ নীতি ও ব্যক্তির করা অপরাধের পাপের ভাগ আপনার আমলনামাতেও যুক্ত হবে। কোন দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও টাকা পাচার না করেও কেবল ভুল জায়গায় ভোট দেয়ার কারণে আপনার আমলনামায় দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের পাপ যুক্ত হতে পারে। তাই ভোট প্রদান কেবল ইহকালীন বিষয়-ই নয় বরং একইসাথে একটি পরকালীন বিষয়ও বটে। তাই ভোট প্রদানে সতর্ক থাকতে হবে।