রুহুল আমিন কিবরিয়া, বগুড়া জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ বিকাল ০৪:৪৪:৪৩
বগুড়ায় জীবিত মুরগির সঙ্গে মরা মুরগি বিক্রি, অভিযোগ স্বীকার ব্যবসায়ীদের
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার নন্দীগ্রাম হাটসংলগ্ন নতুন বাজারের দুই মুরগি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তাজা মুরগির সঙ্গে মরা মুরগি মিশিয়ে জবাই করে বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুডের দোকানে সরবরাহ করার অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যবসায়ী উজ্জ্বল হোসেন ও শামীম হোসেন অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন।
জানা গেছে, উজ্জ্বল হোসেন ও শামীম হোসেন যৌথভাবে নন্দীগ্রাম হাটসংলগ্ন নতুন বাজারে দীর্ঘদিন ধরে মুরগির ব্যবসা করে আসছেন। তাদের কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই বলেও তারা স্বীকার করেছেন।
গত শনিবার এ ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে আসে। পরে রোববার প্রতিবেদক তাদের দোকানে গিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে উজ্জ্বল হোসেন বলেন, “বেশি মরা মুরগি জবাই করিনি, মাত্র দুটি মরা মুরগি তাজা মুরগির সঙ্গে মিশিয়েছিলাম। এখন আর এসব করি না।” তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ আর কখনো করব না।”
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গত ২১ মার্চ ভোররাত প্রায় ৪টার দিকে দোকানে জীবিত মুরগির পাশাপাশি আগে থেকে মারা যাওয়া মুরগিও জবাই করা হচ্ছে। পরে দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুডের দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফুটেজটি নন্দীগ্রাম হাটসংলগ্ন নতুন বাজারের ব্যবসায়ী তোতা মিয়ার দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তোতা মিয়া বলেন, “ওই মুরগি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ করছে। ঈদুল ফিতরের পরের দিন ভোররাতের একটি ঘটনা আমার ক্যামেরায় ধরা পড়ে। বিষয়টি তাদের জানালে তারা উল্টো আমাকে হুমকি দেয়। এরপরও সাধারণ মানুষের স্বার্থে ফুটেজটি সবার কাছে পাঠিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাই, যাতে মানুষকে আর মরা মুরগি খেতে না হয়।”
নন্দীগ্রাম শহরের কয়েকটি ফাস্টফুডের দোকান ও হোটেল মালিক জানান, তারা উজ্জ্বল ও শামীমের দোকান থেকে মুরগি কেনেন। তবে তাদের দাবি, তারা মুরগি কেনার সময় সরাসরি দেখে জবাই করিয়ে নেন।
একই বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী ও পোলট্রি ফার্ম সমিতির সভাপতি বিটল বলেন, “আমিও ওই সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছি। এর আগেও তাদের বিরুদ্ধে মরা মুরগি বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।”
দোকানে উপস্থিত শাহীন নামের এক ক্রেতা বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ কী খাচ্ছি? তাজা মুরগির সঙ্গে মরা মুরগিও বিক্রি করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। ফলে নন্দীগ্রামের বিভিন্ন হোটেল ও ফাস্টফুডের দোকানে পরিবার নিয়ে খাওয়া-দাওয়া এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।”
নন্দীগ্রাম মনসুর হোসেন ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক রাব্বি হোসাইন বলেন, “মরা মুরগি জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। নতুন বাজার একটি উদীয়মান বাজার। এখান থেকে মুরগির বিক্রিও ভালো হয়। তবে মরা মুরগি বিক্রি একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। নন্দীগ্রামে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন ফাস্টফুডের দোকানে মুরগির গ্রিল ও ফ্রাই ব্যাপকভাবে বিক্রি হয়। আমরাও সেখানে খাই। সেখানে যদি মরা মুরগি ব্যবহার হয়ে থাকে, তাহলে তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি।”
তিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত মুরগি ব্যবসায়ী, ফাস্টফুডের দোকান ও হোটেল মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাটি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কল্পনা রানী রায় বলেন, “মরা মুরগি বিক্রি বা বাজারজাত করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লিখিত অভিযোগ বা ভিডিও ফুটেজ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আরা বলেন, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুত তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”